চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম সড়ক টানেল চালুর প্রায় তিন বছর পরও প্রত্যাশিত যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে টানেলের দৈনিক টোল আয় ও পরিচালনা-রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে লোকসান কমাতে টোলহার পুনর্নির্ধারণ, সংযোগ সড়ক উন্নয়ন এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্প ও বন্দরভিত্তিক কার্যক্রম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কর্ণফুলী টানেল থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা টোল আদায় হচ্ছে। বিপরীতে টানেলের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিদিন ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। ফলে প্রতিদিনই গড়ে ১১ থেকে ১২ লাখ টাকার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, টানেল নির্মাণের সময় দক্ষিণ চট্টগ্রামকে ঘিরে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিল্পায়ন ও যানবাহন প্রবাহের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, তার অনেক কিছু এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। কোরিয়ান ইপিজেড, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, নতুন আবাসন প্রকল্প, পারকি পর্যটনকেন্দ্র এবং চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষিণ তীর সম্প্রসারণ কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। একই সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়কের উন্নয়ন ধীর হওয়ায় টানেলে যানবাহন বাড়েনি।
বর্তমানে পণ্যবাহী ট্রাকের একমুখী টোল ৮০০ টাকা এবং যাতায়াতে ১ হাজার ৬০০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করছে, এই টোলের কারণে অনেক যানবাহন বিকল্প পথ ব্যবহার করছে। এ কারণে টোল কাঠামো পুনর্মূল্যায়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে সেতু বিভাগ। সরকারের ধারণা, টোল কিছুটা যৌক্তিক পর্যায়ে আনা গেলে যানবাহনের সংখ্যা বাড়তে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
টানেলের ব্যবহার বাড়াতে সংযোগ সড়ক উন্নয়নকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। আনোয়ারা-বরকল-গাছবাড়িয়া সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প এগিয়ে গেলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার কমবে। এতে দক্ষিণাঞ্চলমুখী যানবাহনের একটি বড় অংশ টানেল ব্যবহার করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া কোরিয়ান ইপিজেড, এনএস ইপিজেড এবং চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্প্রসারণ টানেলের ভবিষ্যৎ রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কর্ণফুলী ড্রাই ডক স্পেশাল ইকোনমিক জোনেও সম্ভাবনা দেখছেন তারা। সেখানে নির্মাণাধীন জেটিগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে ভারী যানবাহন চলাচল বাড়বে এবং টানেলের আয়ও বৃদ্ধি পেতে পারে।
সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, যেসব দিনে এসব জেটিতে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস হয়, সেসব দিনে টানেলের টোল আদায় স্বাভাবিক দিনের তুলনায় কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। তাদের মতে, শিল্প ও বন্দর কার্যক্রম সম্প্রসারিত হলে টানেলের ওপর চাপ ও ব্যবহার—দুটিই বাড়বে।
ফিজিবিলিটি স্টাডিতে টানেলকে ঘিরে দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্পাঞ্চল, আবাসন, সড়ক যোগাযোগ এবং বন্দর সম্প্রসারণের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল। তবে এসব সহায়ক প্রকল্পের অনেকগুলো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ায় টানেলকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
কর্তৃপক্ষের মতে, নদীর তলদেশে নির্মিত টানেলের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ সাধারণ সড়ক বা সেতুর তুলনায় অনেক বেশি। সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ, আলো, বায়ু চলাচল ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা, সিসিটিভি, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থার কারণে ব্যয় বেশি হয়। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর উদ্বোধনের পর প্রথম দিকে দৈনিক পরিচালন ব্যয় প্রায় ৩৭ লাখ টাকা থাকলেও তা কমিয়ে বর্তমানে ২২-২৩ লাখ টাকায় আনা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্ণফুলী টানেলকে শুধু বর্তমান টোল আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়ে মূল্যায়ন করলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এটি চট্টগ্রামকে ‘ওয়ান সিটি, টু টাউনস’ মডেলে এগিয়ে নেওয়া, দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্পায়ন বাড়ানো এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ শক্তিশালী করার একটি কৌশলগত অবকাঠামো প্রকল্প।
তবে দীর্ঘমেয়াদে সফল করতে হলে টোল কাঠামো, যানবাহন প্রবাহ এবং শিল্প বিনিয়োগ—এই তিনটি বিষয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। সহায়ক প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে কর্ণফুলী টানেল ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
মন্তব্য করুন