তহবিল সংকট ও দেনার চাপের মধ্যেও ব্যয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। সংস্থাটির পাইলট, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিভিন্ন বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়েছে। অথচ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বিমানের তহবিল কয়েক হাজার কোটি টাকা কমে যাওয়ায় আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চার মাস আগেও বিমানের তহবিলে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ছিল। বর্তমানে তা কমে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এই অবস্থায় স্থায়ী পাইলটদের বিভিন্ন ভাতা সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর আগে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হয়।
সূত্রগুলোর দাবি, এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে বিমানের বার্ষিক পরিচালন ব্যয় অন্তত ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। এভিয়েশন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি বিমান সংস্থার নগদ তহবিল স্বল্প সময়ে এত বড় পরিমাণ কমে যাওয়া বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) নীতিমালা অনুযায়ী একটি এয়ারলাইন্সের কাছে কয়েক মাসের পরিচালন ব্যয়ের সমপরিমাণ রিজার্ভ থাকা উচিত। কিন্তু বিমানের বর্তমান তহবিল পরিস্থিতি ভবিষ্যতে কোনো আন্তর্জাতিক সংকট বা অপারেশনাল সমস্যার সময় চাপ তৈরি করতে পারে।
তথ্য অনুযায়ী, একদিকে বিমানের আয় ও তহবিল কমছে, অন্যদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ছে। সাধারণ কর্মীদের বেতন আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি শীর্ষ কর্মকর্তাদের পারিশ্রমিকও কয়েক গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিমানের আর্থিক চাপের পেছনে বিভিন্ন বড় ব্যয়ের বিষয় সামনে এসেছে। নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি, পুরনো কর পরিশোধ এবং জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। চার মাসে জ্বালানি বাবদই কয়েকশ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ এয়ারলাইনস পাইলটস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সদস্য বৈমানিকদের কমান্ড অ্যালাউন্স, ইউনিফর্ম, ইন্টারনেট অ্যালাউন্স ও বিশেষ ভাতা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া প্রডাক্টিভিটি ভাতা বৃদ্ধি, এক্সেস ডিউটি ভাতা এবং ওভারসিজ অ্যালাউন্সেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এর আগে ককপিট ক্রু ছাড়া বিমান, বাংলাদেশ ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টার ও বিমান পোলট্রি কমপ্লেক্সের প্রায় সাড়ে তিন হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকটি পদেও পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করা হয়েছে।
বিমানের অভ্যন্তরীণ একটি অংশ মনে করছে, প্রতিষ্ঠানটি যখন আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে, তখন অতিরিক্ত ব্যয় নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, আয় বৃদ্ধির নতুন উৎস তৈরি না করে ব্যয় বাড়ানো হলে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
এদিকে বিমানের প্রধান রাজস্ব খাতগুলোর একটি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবসায়ও পরিবর্তন আসছে। বিদেশি অপারেটর যুক্ত হওয়ায় এই খাতে ভবিষ্যতে আয়ের ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাতা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। বেতন-ভাতা কম থাকায় দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখা কঠিন হচ্ছিল। নতুন সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না বলেও দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য শুধু বেতন-ভাতা সমন্বয় নয়, বরং আয় বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
মন্তব্য করুন