দেশের টোল আদায় ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। যানবাহনের টোল পরিশোধকে সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে দেশের সব সড়ক, সেতু, ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং টানেলকে একটি অভিন্ন ডিজিটাল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি রাজধানীর যানজট কমাতে সায়েদাবাদ, গাবতলী, মহাখালী ও ফুলবাড়িয়া আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল দ্রুত ঢাকা মহানগরীর বাইরে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার সচিবালয়ে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন ও যানজট নিরসন বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বৈঠকে দেশের বিদ্যমান বিচ্ছিন্ন ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) ব্যবস্থাকে একীভূত করে ‘ইউনিফায়েড ন্যাশনাল ইটিসি ফ্রেমওয়ার্ক (ইউএনইএফ)’ চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সেতু, ফ্লাইওভার ও এক্সপ্রেসওয়েতে ভিন্ন ভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে টোল আদায় করা হয়। কোথাও বিআরটিএর আরএফআইডি ট্যাগ, কোথাও অপারেটরের নিজস্ব ট্যাগ, আবার কোথাও অন-বোর্ড ইউনিট (ওবিইউ) ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে ব্যবহারকারীদের একাধিক নিবন্ধন, আলাদা অ্যাকাউন্ট ও পৃথক পেমেন্ট ব্যবস্থার ঝামেলায় পড়তে হয়।
নতুন ব্যবস্থায় একজন ব্যবহারকারী একবার নিবন্ধন করলেই দেশের যেকোনো টোলপ্লাজা, সেতু, ফ্লাইওভার বা টানেলে একই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে টোল পরিশোধ করতে পারবেন। একই সঙ্গে গাড়ির নিবন্ধন, টোল আদায়, তথ্য বিনিময় ও আর্থিক লেনদেন একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ঈদের আগেই দেশের সব টোল অবকাঠামোকে এই একক নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নতুন কাঠামোর অংশ হিসেবে একটি জাতীয় মোবাইল অ্যাপ চালুরও সুপারিশ করা হয়েছে। অ্যাপের মাধ্যমে গাড়ি নিবন্ধন, টোল হার জানা, সড়ক ও টোল স্থাপনার অবস্থান দেখা, ট্রাফিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ দাখিল এবং মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ জমা দেওয়া যাবে।
কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, ভবিষ্যতে সব টোল লেনদেন একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। ব্যবহারকারীরা আগে থেকেই অর্থ জমা রাখবেন এবং টোলপ্লাজা অতিক্রম করার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত অর্থ কেটে নেওয়া হবে। এতে নগদ লেনদেন কমবে এবং টোলপ্লাজায় অপেক্ষার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
এছাড়া ভবিষ্যতে শুধুমাত্র বিআরটিএ সরবরাহকৃত আরএফআইডি ট্যাগ ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। কোনো সংস্থা বা অপারেটর নিজস্ব ট্যাগ ব্যবহার করতে পারবে না। আরএফআইডি ট্যাগ শনাক্ত করতে ব্যর্থ হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি (এএনপিআর) ব্যবহার করা হবে।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বেশ কিছু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন সফটওয়্যার, পেমেন্ট গেটওয়ে ও নিবন্ধন ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। এগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার পাশাপাশি বিদ্যমান ওবিইউ প্রযুক্তিকে আরএফআইডি-ভিত্তিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সফটওয়্যার উন্নয়নের প্রয়োজন হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, জাতীয় পর্যায়ে একক ইটিসি ব্যবস্থা চালু হলে টোল আদায়ে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে, সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে এবং রিয়েল-টাইমে টোল আদায়ের তথ্য পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে যানজট কমানো ও সড়ক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে রাজধানীর যানজট নিরসনের অংশ হিসেবে ঢাকার চারটি বড় আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে, গাবতলী বাস টার্মিনাল হেমায়েতপুরে, সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী বাস টার্মিনাল কাঁচপুরে এবং মহাখালী বাস টার্মিনাল প্রথমে পূর্বাঞ্চলে ও পরে টঙ্গীর কাছাকাছি এলাকায় স্থানান্তর করা হবে।
সরকার মনে করছে, সমন্বিত টোল নেটওয়ার্ক এবং বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং দেশের সড়ক অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় নতুন যুগের সূচনা হবে।
মন্তব্য করুন