ডেস্ক রিপোর্টার
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ১১:১৬ এএম
অনলাইন সংস্করণ

মাছ শিকারি থেকে মানুষ শিকারি

ছবি: সংগৃহীত

নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় মাছ ধরে জীবন চলত শাকের মাঝির। একসময় নদী ও সাগরে মাছ কমে গেলে আয়ও কমতে থাকে। ঠিক তখনই টেকনাফ উপকূলে শুরু হয় সমুদ্রপথে মানবপাচারের নতুন রুট। আর সেই সুযোগেই মাছ শিকারি থেকে ধীরে ধীরে মানুষ শিকারিতে পরিণত হন অনেক জেলে ও মাঝি।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০০৭ সালের দিকে পাচারচক্রের সদস্যরা শাকের মাঝির কাছে প্রস্তাব দেয়—প্রতি যাত্রী জোগাড় করলেই মিলবে মোটা অঙ্কের টাকা। গভীর সমুদ্রে ঝড়ঝঞ্ঝার সঙ্গে লড়াই করে মাছ ধরার চেয়ে মানুষ পাচার অনেক বেশি লাভজনক বুঝতে পেরে তিনি এই চক্রে জড়িয়ে পড়েন।

প্রথমদিকে বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে দরিদ্র তরুণদের রাজি করানো হতো। পরে চক্রটি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। প্রলোভনের পাশাপাশি যুক্ত হয় অপহরণ, জিম্মি এবং মুক্তিপণ আদায়। স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠে একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার সিন্ডিকেট, যেখানে দালাল, মাঝি, মাদক কারবারি ও প্রবাসফেরতদের সমন্বয়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তৈরি হয়।

গত ৮ এপ্রিল আন্দামান সাগরে প্রায় ৩০০ যাত্রীবাহী একটি ট্রলার ডুবে যাওয়ার ঘটনার পর কক্সবাজার ও টেকনাফে মানবপাচার ইস্যু নতুন করে আলোচনায় আসে। তদন্তে জানা যায়, সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাচারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র।

অনুসন্ধানে টেকনাফ ও উখিয়ার অন্তত ১১টি ঘাটের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখান থেকে মানবপাচারের যাত্রা শুরু হয়। এসব ঘাটের মধ্যে সাবরাং, বাহারছড়া, মহেশখালীপাড়া, শীলখালী ও ইনানী অন্যতম। বিশেষ করে বাহারছড়া ও সাবরাং এলাকা পাচারের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে।

একজন রোহিঙ্গা নাগরিক আবু তৈয়বের বয়ান অনুযায়ী, শুধু ২০২৪ ও ২০২৫ সালেই আনুমানিক এক লাখ ২০ হাজার মানুষকে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়েছে। ছোট নৌকায় করে যাত্রীদের গভীর সমুদ্রে নিয়ে বড় ট্রলারে তোলা হতো বলে জানা গেছে।

কোস্ট গার্ডের তথ্যমতে, আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়া ট্রলারটিতে অন্তত ২৬০ জন যাত্রী ছিলেন। উদ্ধার হওয়া কয়েকজন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মানবপাচার চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সৈয়দ মাঝি নামে এক ব্যক্তির নাম, যিনি ওই ট্রলারের মাঝি ছিলেন বলে গোয়েন্দা সূত্র দাবি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, এক লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে পাচারকাজে যুক্ত করা হয়েছিল। যদিও তিনি নিজেকে ভুক্তভোগী দাবি করেছেন, তদন্তে তার বক্তব্যের সঙ্গে বিভিন্ন তথ্যের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, টেকনাফকেন্দ্রিক এই চক্রের অন্যতম সমন্বয়ক নানা মাঝি। তিনি মালয়েশিয়াপ্রবাসী এক মূল হোতার হয়ে যাত্রী সংগ্রহ, ট্রলার প্রস্তুত এবং পাচার কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তাঁর নেতৃত্বে বিশাল নেটওয়ার্ক টেকনাফজুড়ে সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে মানবপাচারের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে উঠে এসেছে মৌলভি আব্দুর রহিমের নাম। ২০০৫ সালের দিকে তিনি প্রথম সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার রুট তৈরি করেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পরে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াভিত্তিক সিন্ডিকেট গড়ে তুলে তিনি পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা শুরু করেন।

তদন্তে আরও জানা গেছে, থাইল্যান্ডের জঙ্গলে পাচার হওয়া মানুষদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। টাকা দিতে না পারলে অনেককে নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার হতে হয়েছে। অতীতে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের গণকবরের ঘটনার সঙ্গেও এই চক্রের সংযোগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতেও সক্রিয় রয়েছে পাচারকারীদের এজেন্ট। বিশেষ করে তরুণী ও যুবকদের টার্গেট করে প্রলোভন দেখানো হয়। বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালিত হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, কক্সবাজার–টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ এলাকায় ছদ্মবেশে কাজ করছে অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা। কেউ সিএনজিচালক, কেউ দোকানি, আবার কেউ স্থানীয় দালাল হিসেবে কাজ করছে। সুযোগ পেলেই অপরিচিত মানুষকে অপহরণ করে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

মানবপাচারের ভয়াবহ এই নেটওয়ার্কে যুক্তদের বিরুদ্ধে একাধিক মাদক, অপহরণ ও মানবপাচার মামলা থাকলেও অনেকেই দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে উপকূলজুড়ে এই অপরাধ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিশ্বনাথে সড়কের পাশে পড়েছিল নবজাতক

1

কঙ্গোতে ইবোলা ভাইরাসে ৮৮ জনের মৃত্যু

2

ঘটনা অনেক দেরিতে জানলাম

3

দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আরও দুই বছর লাগবে: অর্থমন্ত্রী

4

তারুণ্যের ভিড়ে বিশ্বকাপে নজর কাড়বেন ৮ ‘বয়স্ক’ ফুটবলার

5

দলীয় নেতাদের সঙ্গে আজ মতবিনিময়ে বসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহ

6

প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল করলেন মনিরা শারমিন

7

পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশকে প্রধানমন্ত্রীর অ

8

নতুন বছরের শুরুতেই যেসব ফোনে বন্ধ হচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ

9

ইরানের হামলাকে ‘তুচ্ছ’ বললেন ট্রাম্প

10

গণরায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে বিএনপি

11

বিশ্বকাপে পরিচ্ছন্নতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন জাপানি দর্শকরা

12

৯ জুলাই পর্যন্ত চলবে বাজেট অধিবেশন, আলোচনার সময় ৪০ ঘণ্টা

13

সোনার দাম কমল ভরিতে ২১৫৮ টাকা

14

এনসিপিতে যোগ দিলেন নিজামীর ছেলে ড. নাদিমুর রহমান

15

বিএসএফের ধারাবাহিক আইন লঙ্ঘনের চেষ্টা ব্যর্থ

16

ছাগলকাণ্ডে আলোচিত ইমরানের জামিন স্থগিত চেয়ে আবেদন

17

বৃহত্তর খুলনার প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি ব্রজলাল কল

18

আমি শুধু ধর্ষণ করছি, মারছে ডলার

19

পোশাক নয়, অপরাধীর মানসিকতাই যৌন সহিংসতার মূল কারণ

20