বাবা দিবস এলেই চারদিকে বাবাকে ঘিরে স্মৃতি, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতার নানা গল্প উঠে আসে। কিন্তু এই উদযাপনের আড়ালে থেকে যান এমন অনেক নারী, যারা একাই সন্তানের জীবনে মা ও বাবা—দুই ভূমিকাই পালন করছেন। তাদের নীরব সংগ্রাম, ত্যাগ এবং ভালোবাসাও সমানভাবে সম্মানের দাবিদার।
জীবনের বাস্তবতা সবসময় একরকম থাকে না। কখনও মৃত্যু, কখনও বিচ্ছেদ, কখনও পরিত্যাগ কিংবা কঠিন সামাজিক পরিস্থিতির কারণে অনেক নারীকে একাই সন্তানের দায়িত্ব নিতে হয়। সেই মুহূর্ত থেকে তারা শুধু মা নন, হয়ে ওঠেন সন্তানের নিরাপত্তা, সাহস, আশ্রয় এবং ভবিষ্যতের ভিত্তি।
একজন একক মায়ের প্রতিটি দিন শুরু হয় দায়িত্বের মধ্য দিয়ে। সংসার, চাকরি, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—সবকিছু একাই সামলাতে হয় তাকে। নিজের ক্লান্তি, ভয় কিংবা অনিশ্চয়তা আড়াল করে সন্তানের সামনে শক্ত থাকার চেষ্টাই হয়ে ওঠে তার জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই।
সন্তানের জীবনে বাবার অনুপস্থিতি যেন কোনো অভাব তৈরি না করে, সেই চেষ্টা করেন অনেক মা। কখনও বন্ধুর মতো পাশে থাকেন, কখনও কঠোর অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সন্তানের ভুলে শাসন, সাফল্যে উৎসাহ এবং ব্যর্থতায় সাহস দেওয়ার দায়িত্বও একাই পালন করেন তারা।
তবে একজন মা কখনও একজন বাবার বিকল্প নন, যেমন একজন বাবাও মায়ের বিকল্প হতে পারেন না। দুই সম্পর্কের অনুভব ও ভূমিকা আলাদা। কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতায় যখন একজন নারীকে দুই মানুষের দায়িত্ব একসঙ্গে বহন করতে হয়, তখন সেই আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের স্বীকৃতি দেওয়াটা সমাজের দায়িত্ব।
সমাজে এখনও অনেক একক মাকে নানা ধরনের প্রশ্ন, সমালোচনা ও অযাচিত মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়। অথচ তাদের সংগ্রামের গভীরতা কিংবা ত্যাগের গল্প খুব কম মানুষই জানতে চান। কর্মক্ষেত্র, পরিবার ও সমাজ—সব জায়গায় তাদের প্রয়োজন সম্মান, সহযোগিতা এবং সমান সুযোগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপদ, স্নেহময় এবং স্থিতিশীল পরিবেশ। একজন দায়িত্বশীল একক মা সেই পরিবেশ তৈরি করতে পারলে সন্তানের আত্মবিশ্বাস, মানসিক বিকাশ এবং মূল্যবোধ দৃঢ় ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠে।
আজ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল অনেক মানুষই গর্বের সঙ্গে স্বীকার করেন, তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন তাদের মা। সেই মা-ই প্রথম হাত ধরে পথ দেখিয়েছেন, ব্যর্থতার সময় সাহস জুগিয়েছেন এবং প্রয়োজনে কঠিন বাস্তবতার শিক্ষা দিয়েছেন।
বাবা দিবস তাই শুধু বাবাদের সম্মান জানানোর দিন নয়; এটি দায়িত্ব, ত্যাগ ও ভালোবাসাকে শ্রদ্ধা জানানোরও উপলক্ষ। সেই সম্মানের পরিধিতে স্থান পাওয়া উচিত সেসব একক মায়ের, যারা নিঃশব্দে দুই মানুষের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলেছেন।
কিছু সম্পর্কের পরিচয় আলাদা করে লেখা থাকে না, কিছু ত্যাগেরও কোনো নাম হয় না। তবু অসংখ্য সন্তানের জীবনে একক মায়েরা নীরবে লিখে চলেছেন ভালোবাসা, দায়িত্ব ও আত্মত্যাগের অনন্য গল্প। বাবা দিবসের গভীরতম শ্রদ্ধা তাই তাদের প্রতিও।
মন্তব্য করুন