ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবনকাল খুব দীর্ঘ না হলেও তাদের সৃজনশীল কর্ম সমাজে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যায়। ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক কেদারনাথ মজুমদার ছিলেন তেমনই একজন কর্মনিষ্ঠ মানুষ, যিনি ময়মনসিংহের শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
কেদারনাথ মজুমদারের জন্ম ১৮৭০ সালে তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার কাপাসাটিয়া গ্রামে। শৈশব থেকেই তার মধ্যে জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্য অনুরাগের বিকাশ ঘটে। ১৮৮৪ সালে তিনি ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে ভর্তি হন। সেই সময় ময়মনসিংহ ছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশমান কেন্দ্র, যেখানে আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চার পরিবেশও তৈরি হয়েছিল।
ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের পরিবেশ কেদারনাথের চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। স্কুলের শিক্ষক ও সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসে তিনি সাহিত্য, ইতিহাস ও সমাজচিন্তার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বিদ্যালয়ের ‘মনোরঞ্জিকা ক্লাব’-এর কার্যক্রমেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং নিজের লেখা প্রবন্ধ ও রচনা উপস্থাপন করতেন।
সে সময় মনোরঞ্জিকা ক্লাব শুধু শিক্ষার্থীদের সংগঠন ছিল না, বরং সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। নিয়মিত পাঠচক্র, বক্তৃতা ও আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চিন্তার বিকাশ ঘটানো হতো। কেদারনাথ এই পরিবেশকে নিজের সাহিত্যিক বিকাশের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন।
ছাত্রজীবনেই কেদারনাথ মজুমদার প্রকাশনার জগতে প্রবেশ করেন। অল্প বয়সে তিনি ‘কুমার’ নামে একটি সাময়িকপত্র প্রকাশ শুরু করেন। ময়মনসিংহের স্থানীয় মুদ্রণ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে প্রকাশিত এই পত্রিকা তার ভবিষ্যৎ সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার পথ তৈরি করে।
পরবর্তী সময়ে তিনি ‘আরতি’, ‘বাসনা’ এবং সর্বোপরি ‘সৌরভ’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯১৩ সালে প্রকাশিত ‘সৌরভ’ দীর্ঘদিন ধরে বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ময়মনসিংহে নিজের প্রতিষ্ঠিত গবেষণা কেন্দ্র থেকে তিনি পত্রিকাটি সম্পাদনা করতেন।
‘সৌরভ’ শুধু আঞ্চলিক সাহিত্য প্রকাশের মাধ্যম ছিল না, বরং বিশ্বের সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে ময়মনসিংহবাসীর পরিচয় ঘটানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল। প্রতিষ্ঠিত লেখকদের পাশাপাশি নতুন লেখকদের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও পত্রিকাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কেদারনাথ মজুমদারের হাত ধরেই লোকসাহিত্য গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে ময়মনসিংহের যোগসূত্র তৈরি হয়। তার সম্পাদিত ‘সৌরভ’ পত্রিকায় চন্দ্র কুমার দে’র লেখা প্রকাশিত হয়, যা পরবর্তীতে মৈমনসিংহ গীতিকার সংগ্রহ ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইতিহাসচর্চাতেও কেদারনাথের অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ইতিহাস, শিক্ষা ও সমাজজীবন নিয়ে বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করেন। শিক্ষার্থীদের জন্যও তিনি ‘ঢাকা সহচর’, ‘ময়মনসিংহ সহচর’, ‘বাংলা সহচর’সহ নানা সহায়ক গ্রন্থ তৈরি করেন।
ময়মনসিংহের সাহিত্য আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার ‘রিসার্চ হাউস’ এক সময় শহরের সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। গৌরীপুর পূর্ণিমা সাহিত্য সম্মেলনসহ নানা সাহিত্যিক আয়োজনের পেছনেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
দারিদ্র্য ও শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেও কেদারনাথ তার সৃজনশীল কাজ থামাননি। মায়ের স্মৃতিতে ১৯১৭ সালে তিনি ‘জয়দুর্গা এম. ই. স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা তার শিক্ষা বিস্তারের আকাঙ্ক্ষার পরিচয় বহন করে।
ময়মনসিংহে ১৩১৮ বঙ্গাব্দে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনেও তিনি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার চিন্তা, উদ্যোগ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নগরজীবনের মূল্যবোধ ও সাহিত্যচেতনার বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে।
স্বল্পায়ু জীবনে কেদারনাথ মজুমদার যে সৃজনশীল উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, তা আজও ময়মনসিংহের ইতিহাস ও বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
মন্তব্য করুন