ডেস্ক রিপোর্টার
প্রকাশ : সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ০৬:৪৩ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

মাতৃত্ব শৃঙ্খল নয়, হোক আনন্দের

ছবি: সংগৃহীত

একটি বিড়াল মা হয়েছে। সে নিজের ছানাদের যত্ন নিচ্ছে, আবার মাঝেমধ্যে তাদের রেখে নিজের মতো করেও কিছুটা সময় কাটিয়ে নিচ্ছে। তার খাদ্যের ব্যবস্থা কাছেই থাকলেও সে কেবল সন্তানের মধ্যেই আটকে নেই। নিজের বিশ্রাম, নিজের যত্ন ও ‘নিজের সময়’কেও সে সমানভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রাণিজগতের এই স্বাভাবিক আচরণ আমাদের এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দেখায়—মা হওয়া মানে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলা নয়।

মানবসমাজে, বিশেষ করে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে, মাতৃত্বকে এক ধরনের চরম ত্যাগ ও পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। মায়ের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয় নিঃস্বার্থ আত্মবিসর্জন, যেখানে নিজের সুখ, স্বপ্ন বা বিশ্রামের কোনো স্থান থাকে না। একজন ‘আদর্শ মা’র সংজ্ঞা যেন দাঁড়িয়ে যায় নিজের জীবনকে পুরোপুরি সন্তানের জন্য বিলীন করে দেওয়ার মধ্যে।

এই ধারণার সমালোচনা করেছেন লেখক হুমায়ুন আজাদ। তার মতে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মায়েদের ওপর এমন এক ‘মহত্ত্ব’ চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা বাস্তবে তাদের মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকারকেই সীমিত করে ফেলে। ফলে একজন নারী যত বেশি নিজেকে ত্যাগ করেন, তাকে তত বেশি ‘ভালো মা’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়।

সমাজে এমনও দেখা যায়, একজন নারী যদি নিজের জন্য সময় চান, নিজের ক্যারিয়ার বা মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভাবেন, তবে তাকে অনেক সময় ‘স্বার্থপর’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। অথচ মাতৃত্ব কোনো প্রতিযোগিতা নয়, কিংবা নিজেকে নিঃশেষ করার কোনো শর্তও নয়। এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মাত্র।

অন্যদিকে প্রাণিজগতে মাতৃত্বের চিত্র অনেক বেশি বাস্তব ও ভারসাম্যপূর্ণ। সেখানে মা প্রাণীরা সন্তানের যত্ন নেয়, কিন্তু নিজের অস্তিত্ব বা প্রয়োজনকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে না। ক্ষুধা লাগলে তারা আগে নিজেদের খাওয়ায়, ক্লান্ত হলে বিশ্রাম নেয় এবং সন্তান বড় হলে তাকে স্বাভাবিকভাবে স্বাধীন হতে দেয়।

মানবসমাজে আবার মাতৃত্বকে এতটাই ‘আদর্শিক’ করে তোলা হয়েছে যে, গর্ভধারণকেই নারীত্বের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। ফলে অনেক নারীকে সামাজিক চাপের মুখে পড়ে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যার জন্য তারা মানসিকভাবে প্রস্তুত নাও থাকতে পারেন। আবার যারা সন্তান নিতে চান না বা পারেন না, তাদেরও সমাজের নানা প্রশ্ন ও অবমূল্যায়নের মুখোমুখি হতে হয়।

সবচেয়ে করুণ দিক হলো, এই চাপ ও প্রত্যাশার ভার অনেক সময় নারীদের জীবনে গভীর যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নবজাতক পরিত্যক্ত হওয়ার মতো ঘটনাও এই সামাজিক কাঠামোর ভেতরেই এক নির্মম বাস্তবতা হিসেবে থেকে যায়, যা শুধুই ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

মাতৃত্বকে যদি আমরা প্রাণিজগতের মতো করে আরও প্রাকৃতিক ও বাস্তবভাবে দেখতে শিখি, তাহলে এই অতিরিক্ত পবিত্রতার বোঝা অনেকটাই হালকা হতে পারে। একজন মা একই সঙ্গে মা এবং মানুষ—এই সত্যটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মাকে সম্মান দেওয়া অবশ্যই জরুরি, কিন্তু সেই সম্মান যেন তার স্বাধীনতা ও ব্যক্তিসত্তাকে গ্রাস না করে। একজন মানসিকভাবে সুস্থ ও সুখী মা তার সন্তানের জন্য অনেক বেশি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন। তাই মাতৃত্বকে শৃঙ্খল নয়, বরং জীবনের একটি স্বাভাবিক ও আনন্দময় অধ্যায় হিসেবেই দেখা উচিত।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কমছেই না শিশু নির্যাতন

1

দেশে খাদ্যশস্যের মজুত ২০ লাখ টন ছাড়াল

2

মন্তেশ্বরে বড় ব্যবধানে হারলেন সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী

3

মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য

4

আগামী সপ্তাহে ইসলামাবাদে বসতে পারে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা

5

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ভারতে ফের জ্বালানির দাম বাড়ল

6

মেসির ছবি এঁকে প্রশংসায় ভাসছেন চঞ্চল

7

২৬ জুন পবিত্র আশুরা, মহররম মাসের চাঁদ দেখা গেছে

8

সোশ্যাল মিডিয়া যেভাবে স্পেনে অভিবাসী সংকট তৈরি করল

9

দুষ্ট লোকে বলে ‘টুকু আসে টুকু যায়’: লোডশেডিং নিয়ে রুমিন ফারহ

10

হান্টাভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া জাহাজ স্পেনে পৌঁছেছে

11

কত বছর বয়সে রাজনীতি ছাড়বেন জানালেন ফজলুর রহমান

12

সৌদি প্রবাসীদের ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে সুখবর

13

হোয়াইট হাউস অনুষ্ঠানে হামলার চাঞ্চল্যকর ছবি প্রকাশ করলেন ট্র

14

ধ্বংসস্তূপের নিচে ৯৭ বছরের এক নারী এবং তার ৪ ঘণ্টার 'যুদ্ধ'

15

আমরা ব্রাজিলিয়ানরাও তোমাদের ভালোবাসি: ব্রাজিল গোলরক্ষক

16

ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতি যেমন চলছে

17

ভারতীয়দের নিয়ে অপপ্রচারে কঠোর সিঙ্গাপুর

18

আধুনিক স্ট্রিট লাইটে ঝলমল করছে লালমনিরহাট

19

শর্তের ব্যাপারে অনড় ইরান

20