জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্ব ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। দেশগুলো গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করলেও চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রাক্-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে। আর বর্তমান নীতি ও কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচি (ইউএনইপি) বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ সতর্কবার্তা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের পূর্বাভাসের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণায়নের আশঙ্কা বেড়েছে। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে যাওয়া, দেশটির কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি এবং অতীতের নিঃসরণের হিসাব সংশোধনের মতো বিষয় ভূমিকা রেখেছে।
ইউএনইপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যেসব দেশে কার্বন নিঃসরণ বেড়েছে, সেসব দেশের সম্মিলিত নিঃসরণ বৃদ্ধির প্রায় ৭০ শতাংশের জন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্র। ওই বছর দেশটিতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের সমতুল্য নিঃসরণ বেড়েছে ১৩ কোটি ৩০ লাখ টন। বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের শীর্ষ ২০ অর্থনীতির অন্যান্য দেশ হয় নিঃসরণ কমিয়েছে, নয়তো নিঃসরণ বৃদ্ধির গতি ধীর করেছে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৫ সালে নিঃসরণ বেড়েছে এমন ১২৪টি দেশ থেকে অতিরিক্ত ১৮ কোটি ৯০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইডের সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে যুক্ত হয়েছে।
২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রাক্-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক নিচে রাখা এবং সম্ভব হলে ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ইউএনইপির নতুন পূর্বাভাস বলছে, দেশগুলোর দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলেও বিশ্ব সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ থেকে অনেক দূরে থাকবে।
বর্তমানে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রাক্-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্য অর্জন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
এ পরিস্থিতিতে তাপমাত্রা সাময়িকভাবে ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে গেলেও পরে বায়ুমণ্ডল থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণের মাধ্যমে তা কমিয়ে আনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে এ ধরনের প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয় সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্ব নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে বিপজ্জনকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। তবে পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও উপায় এখনো রয়েছে।
ইউএনইপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সীমিত রাখতে হলে ২০২৫ সালের মাত্রার তুলনায় ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ ১৮ শতাংশ, ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৬৯ শতাংশ কমাতে হবে।
কিন্তু বিভিন্ন দেশের বর্তমান জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে নিঃসরণ কমার সম্ভাবনা মাত্র ৫ থেকে ৮ শতাংশ। ২০৩৫ সালের মধ্যে এই হ্রাস ১১ থেকে ১৫ শতাংশ হতে পারে। অর্থাৎ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে যতটা নিঃসরণ কমানো প্রয়োজন, দেশগুলোর বর্তমান পরিকল্পনা তার তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ও ইউএনইপির কোপেনহেগেন জলবায়ু কেন্দ্রের পরিচালক অ্যান ওলহফের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তনের কারণে শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির পূর্বাভাসে আরও প্রায় ০.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস যুক্ত হতে পারে।
জলবায়ু বিশ্লেষণ সংস্থা ক্লাইমেট অ্যানালিটিকসের প্রধান বিল হেয়ার বলেছেন, অতিরিক্ত এই উষ্ণতা প্রায় ১৪ কোটি মানুষকে বিপজ্জনক মাত্রার তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে আমাজন বন এবং গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বরফস্তরের স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়তে পারে।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ুবিজ্ঞানী মাইকেল মানের হিসাব অনুযায়ী, তাপমাত্রার এই অতিরিক্ত বৃদ্ধি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়তে থাকলে তীব্র তাপপ্রবাহ, বিধ্বংসী বন্যা, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং মানুষের মৃত্যুঝুঁকি বাড়বে। বিশেষ করে আফ্রিকাসহ জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যবহার বাড়ছে। পাশাপাশি কিছু দেশের জলবায়ুনীতি গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতেও ভূমিকা রাখছে। তবে এসব অগ্রগতি সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে নিঃসরণ কমানোর গতি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
জলবায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ আরও ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে উঠবে। এজন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং দেশগুলোর ঘোষিত জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন জরুরি।
ইউএনইপির প্রতিবেদনের মূল বার্তা হলো, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ঘাটতি, নিঃসরণ কমানোর ধীরগতি এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা বিশ্বকে আরও উষ্ণ ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মন্তব্য করুন