অনলাইন নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৯ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

পাকিস্তানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সংকট

পাকিস্তানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ আবারও সামনে এসেছে। পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ও সরকারের মধ্যে সংলাপের উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। পিটিআই প্রতিবাদ মিছিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কর্মীদের গ্রেপ্তারের অভিযান চালানো হয়। অন্যদিকে, খাইবার পাখতুনখোয়া (কেপি) প্রদেশের সরকারকে সরিয়ে সেখানে গভর্নরের শাসন জারির হুমকি দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।

প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সরকার কেপিতে জরুরি অবস্থা জারি ও গভর্নরের শাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এ পদক্ষেপ প্রদেশটির মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকার ও কেপির প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে সংঘাতও ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের বক্তব্যের জবাবে কেপির মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিও কঠোর অবস্থান জানিয়েছেন।

সংলাপের উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর সরকার আবারও বলপ্রয়োগ, হুমকি ও কঠোর পদক্ষেপের পথে এগিয়েছে বলে মনে করেন পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোদি। তাঁর বিশ্লেষণে, কেপিতে জরুরি অবস্থা জারি ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এই সংঘাতেরই অংশ।

দমন-পীড়নে দুর্বল হচ্ছে গণতন্ত্র

পিটিআইয়ের আটজনের বেশি সংসদ সদস্যকে অপহরণ এবং তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে আটকে রাখার অভিযোগকে বলপ্রয়োগের গুরুতর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন মালিহা লোদি। তাঁদের মধ্যে জাতীয় পরিষদের তিনজন সদস্যও রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁর মতে, বিরোধী দলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বলপ্রয়োগের আশ্রয় নেওয়ায় সরকারের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে এবং দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হচ্ছে। গত কয়েক বছরে বিরোধী দল ও সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যেও এই প্রবণতা দেখা গেছে।

এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে জনসমাবেশে নিষেধাজ্ঞা, বিক্ষোভ দমন, বিরোধী দলের সমর্থকদের গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক নেতাদের বাড়িতে অভিযান, মামলা, সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ, ইন্টারনেট ব্যবহারে বিধিনিষেধ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিতর্কিত সাংবিধানিক সংশোধনী এবং আদালতের আদেশ অমান্য করার অভিযোগ বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ওপর নজরদারি ও ভারসাম্য রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হলে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিস্তার ঘটতে পারে। ফলে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামো টিকে থাকলেও এর কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

মালিহা লোদির বিশ্লেষণে, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতে গিয়ে সরকার যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা শক্তিমত্তার পরিবর্তে দুর্বলতার ইঙ্গিত দিতে পারে।

জোর করে শান্তি প্রতিষ্ঠা কি স্থিতিশীলতার সমাধান?

পাকিস্তানের অতীতেও বিভিন্ন বেসামরিক সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের প্রতি অসহিষ্ণুতা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কারাগারে পাঠানো, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ উঠেছে। তবে মালিহা লোদির মতে, বর্তমান সময়ে দমনমূলক পদক্ষেপের ব্যাপ্তি ও মাত্রা অতীতের বেসামরিক সরকারগুলোর তুলনায় বেশি।

ডিজিটাল প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের কারণে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রও বেড়েছে। তাঁর বিশ্লেষণে, বর্তমান সরকার ডিজিটাল পরিসরে বিধিনিষেধ, সেন্সরশিপ এবং ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় আরও সক্রিয় হয়েছে।

সরকারের সমর্থকেরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এসব পদক্ষেপকে প্রয়োজনীয় বলে ব্যাখ্যা করেন। তবে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সাময়িক শান্ত পরিস্থিতি তৈরি করা গেলেও তা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেয় না। বরং দমন-পীড়ন রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ায়, রাষ্ট্র ও নাগরিকদের মধ্যে আস্থা কমায় এবং সমাজে বিভক্তি আরও গভীর করে।

পিটিআই পাকিস্তানের উল্লেখযোগ্য জনসমর্থনসম্পন্ন একটি রাজনৈতিক দল। জাতীয় পরিষদে দলটির প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এবং খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশেও দলটি সরকার পরিচালনা করছে। এমন একটি দলকে দমন করা বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিচ্ছিন্ন করে রাখার মাধ্যমে স্থায়ী স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন বলে মনে করেন লেখক।

রাজনৈতিক সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব

পাকিস্তানে সরকার ও বিরোধী দলের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। ঘন ঘন ধর্মঘট, অবরোধ ও শহরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের পরিবেশও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এখনও প্রত্যাশিত গতি না পাওয়ার মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। সংঘাত ও অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থানে থাকছেন, যা নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে অর্থের কিস্তি পাওয়াকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হলেও পাকিস্তানের অর্থনীতি এখনও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগোতে পারেনি বলে মনে করেন মালিহা লোদি। তাঁর উল্লেখ অনুযায়ী, গ্যালাপ ও ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপগুলোতেও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের আস্থা কমে যাওয়া এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে হতাশার চিত্র উঠে এসেছে।

তাঁর মতে, রাজনৈতিক সংঘাত অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক সমস্যার কার্যকর সমাধান খুঁজে পাওয়াও কঠিন হবে।

স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা

পাকিস্তানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা এবং পারস্পরিক ছাড়ের ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি। বিভক্ত ও মেরুকরণে জর্জরিত দেশে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা কঠিন।

মালিহা লোদির মতে, এমন সংলাপ প্রয়োজন, যার লক্ষ্য হবে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সহাবস্থানের পথ তৈরি করা। কেবল আসন্ন প্রতিবাদ মিছিল ঠেকানোর প্রয়োজনে আলোচনা শুরু করলে স্থায়ী সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়।

তিনি পিটিআই নেতা ইমরান খানের সঙ্গে আচরণ এবং আদালতের নির্দেশনা অনুসরণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে, সাম্প্রতিক সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার একটি কারণ ছিল আলোচনার বিষয়ে পরামর্শ করতে বিরোধী নেতাদের ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি না দেওয়া। আইন অনুযায়ী তাঁর প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন ও নির্বাচনি ভিত্তি রয়েছে—এমন রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে বাদ দিয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা সম্ভব নয়।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ‘বিজয়ীই সব পাবে’ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি চলে আসছে। অথচ নির্বাচনে জয়ী দলও মোট ভোটের সংখ্যালঘু অংশের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসতে পারে। বর্তমান সরকারের নির্বাচন নিয়েও বিতর্ক রয়েছে বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ধরনের একতরফা শাসনব্যবস্থা গণতন্ত্রকে দুর্বল করার পাশাপাশি কার্যকর প্রশাসন পরিচালনাকেও বাধাগ্রস্ত করে। পাকিস্তানের মতো ফেডারেল রাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় সরকার ও বিরোধী দল পরিচালিত প্রদেশগুলোর মধ্যে সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা গড়ে তোলা বিশেষভাবে জরুরি।

আইনের শাসনই স্থিতিশীলতার ভিত্তি

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো আইনের শাসন নিশ্চিত করা। সাময়িক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল না করে বরং শক্তিশালী করতে হবে। কার্যকর প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করে।

ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ, মৌলিক অধিকার সুরক্ষা এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি ও ক্ষমতার ভারসাম্য। এসব ব্যবস্থা দুর্বল হলে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা বাড়ানো এবং গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা সংকুচিত করার মাধ্যমে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা পাকিস্তানের অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ঝুঁকিপূর্ণ। মালিহা লোদির বিশ্লেষণে, এ ধরনের পদক্ষেপ রাজনৈতিক সংঘাত কমানোর পরিবর্তে আরও বাড়াতে পারে।

সব মিলিয়ে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণে দমন-পীড়নের পরিবর্তে সংলাপ, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি।

লেখক: মালিহা লোদি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত।

সূত্র: ডন নিউজ

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দিনাজপুরে ৩৮.৩ ডিগ্রি তাপমাত্রায় প্রাণিকূলেও নাভিশ্বাস

1

সরকার বাধা দিলে লংমার্চের ৬ দফা এক দফাতে পরিণত হবে: নাহিদ

2

আরো ২০ দিনের তেলের মজুত ছাড়বে জাপান

3

ঐতিহাসিক সেঞ্চুরিতে রেকর্ড ভাঙলেন মুশফিক

4

গোসলে নেমে তলিয়ে গেলেন দাদা, বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ গেল নাতি-নাত

5

সেরা গোলের দৌড়ে মেসি-আলভারেজ, সমর্থকদের ভোটে নির্বাচিত হবে ব

6

পারস্য উপসাগরে আটকা ২০ হাজার নাবিক

7

মমতাকে হারানোর পেছনে হাসিনার হাত রয়েছে

8

‘ওদের আছে মেসি, আমাদের আছে সালাহ’

9

২০২৬ ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে শীর্ষ পাঁচে যারা

10

ব্যাচেলর পয়েন্টে ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা লড়াই

11

ছেলে থিয়াগো মেসির বার্সা যুব একাডেমিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে যা ব

12

৯ জুলাই পর্যন্ত চলবে বাজেট অধিবেশন, আলোচনার সময় ৪০ ঘণ্টা

13

ভেনেজুয়েলা ভূমিকম্পে ১ লাখ মৃত্যুর আশঙ্কা ইউএসজিএসের

14

২০২৬-২৭ বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব

15

ঘানার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করলো ইংল্যান্ড

16

পশ্চিমবঙ্গে বিজয় মিছিল নিষিদ্ধ: নির্বাচন কমিশনের জরুরি নির্দ

17

পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পারিশ্রমিক মেরে খাওয়ার ঘটনা শুনে অবাক তা

18

বিশ্বকাপে বিশ্ব অর্থনীতির জয়গান

19

রূপপুরে জ্বালানি লোডিংয়ের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু

20