আর্জেন্টিনার ছোট্ট শহর রোজারিও। ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন জন্ম নেওয়া লিওনেল মেসির অল্প বয়সেই ধরা পড়ল হরমোনের সমস্যা। বাকি দশজন শিশুর মতো বয়সের সঙ্গে স্বাভাবিক শারিরীক বৃদ্ধিটা হচ্ছিল না। চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল! যা ছিল তার পিতামাতার সাধ্যের বাইরে। অতটুকুন বয়সে বল পায়ে মেসির নৈপুন্য ছিল চোখে পড়ার মতো। চৌদ্দ আউন্সের চর্মগোলকটা নিয়ে তার জাদুকরী ড্রিবলিং নজর কাড়লো স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার তৎকালীন পরিচালক কার্লেস রেক্সাসের। রত্ন চিনতে বিন্দুমাত্র দেরী করলেন না। হয়তো পেয়ে গিয়েছিলেন অযুত নিযুত সময়ের সেরা ফুটবলারকেই!
রেক্সাস প্রতিশ্রুতি দিলেন চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনের। রাজি হলেন পিতামাতা। হাতের কাছে ছিলো না কোনো কাগজ। বাধ্য হয়ে টিস্যু পেপারে সারতে হলো চুক্তি। ব্যস! ছেলেটার জায়গা হলো বার্সেলোনার আতুড়ঘর খ্যাত লা মাসিয়ায়। মেসি হয়ে গেলেন বার্সার! টিস্যু পেপারে করা সে চুক্তিতে লেখা ছিল, ‘বার্সেলোনায় ১৪ ডিসেম্বর, ২০০০ সালে মিনগেলা, হোরাশিও আর বার্সার ক্রীড়া পরিচালক কার্লোস রেক্সাসের উপস্থিতিতে পূর্ণ দায়িত্বের সঙ্গে নির্দিষ্ট অঙ্কে লিওনেল মেসিকে সই করানোর ব্যাপারে একমত হওয়া গেল।’ পেপারে নীল কালিতে চুক্তি লেখা হয়েছিল। পরে ২০২৪ সালে সেই টিস্যু নিলামে বিক্রি হয়েছিল ১১ কোটি টাকায়।
২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট। টিস্যু পেপার থেকে তিন পাতার চিরকুট। অমরত্বের স্বীকৃতি পাওয়া গল্পটাকে মেসি মিলিয়ে দিলেন আরেকবার। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিলেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক। এবারে তিনপাতার একটি চিরকুট লিখলেন নিজের হাতে। সেই ছবি পোস্ট করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
তাতে লিখা, ‘আমি শপথ করে বলছি, আমি সবসময় আমার সবকিছু দিয়েছি, শুধু শেষ কয়েক বছর নয়, যখন সবকিছু জেতা হয়েছিল, তখনও নয়; আমি সবসময় এই জার্সির জন্য লড়াই করেছি এবং আমার সবকিছু দিয়েছি, তাদের আনন্দ দেওয়ার জন্য এবং ফুটবলের মাধ্যমে তাদের আর্জেন্টাইন হতে গর্বিত করার জন্য।’
মেটলাইফ স্টেডিয়ামে এবার মেসির হাতে শিরোপা উঠেনি। স্পেন ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে পেয়েছে শিরোপা। চোখের জলে সেদিন সবুজ ঘাস ভাসিয়েছেন মেসি। ফাইনালের দুদিন পর লিখা সেই চিঠিতেই নিজের অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন।
রোজারিওতেই আটকে যেতে পারতো যে জীবন সে জীবন থেমে থাকেনি। টিস্যুতে শুরু হওয়া চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়েছে। বার্সেলোনা থেকে মেসি গিয়েছেন পিএসজিতে। এখন সেই গন্তব্য ইন্টার মায়ামিতে। আর্জেন্টিনার জার্সির সঙ্গে সুঁই-সুঁতোর বন্ধনটাও আলাদা করার সময় চলে এসেছে। তাইতো চিরকুটে লিখা চিঠিতেই মেসি জানিয়ে দিলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি, এটাই সেই মুহূর্ত।’
বয়স বাড়ছে, সময়ও ফুরিয়ে আসছে, ৩৯ পেরিয়ে গেছেন। কিন্তু কমেনি তার জৌলুস, কমেনি ক্ষিপ্রতা, কমেনি জাদুকরী ড্রিবলিংয়ের মুগ্ধতা। কিশোর, তরুণ কিংবা যুবক থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী ভদ্রলোক এখনো রাত জাগেন। কণ্ঠে ধ্রুপদির সুর তোলা পিটার ড্রুরি সেই কথাটাও যেন অম্বরত্বের স্বীকৃতি, ‘দ্য লিটল বয় ফ্রম রোজারিও, হ্যাজ জাস্ট পিচড আপ ইন হ্যাভেন..।’