অনলাইন নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

প্রযুক্তিগত সাফল্য সত্ত্বেও কেন আগের মতো প্রশংসা পাচ্ছেন না ইলন মাস্ক

প্রযুক্তিগত সাফল্যে আবারও আলোচনায় ইলন মাস্ক

মহাকাশ প্রযুক্তি থেকে চালকবিহীন গাড়ি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন বিশ্বের অন্যতম ধনী উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক। তবে প্রযুক্তিগত সাফল্য সত্ত্বেও আগের বছরগুলোর মতো নিঃশর্ত প্রশংসা পাচ্ছেন না তিনি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমবিষয়ক অধ্যাপক অ্যান্ড্রু সেলেপাকের মতে, মহাকাশ ভ্রমণ ও উড়ন্ত গাড়ি নিয়ে কয়েক দশক ধরে যে প্রযুক্তিগত স্বপ্ন দেখানো হয়েছে, মাস্ক সেগুলোর কিছু বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অথচ তাঁর কাজের জন্য প্রত্যাশিত বিস্ময় ও মনোযোগ আগের মতো দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি।

সাম্প্রতিক সময়ে মাস্কের প্রযুক্তিগত উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক ভূমিকা—দুই দিকই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

কক্ষপথে স্টারশিপ, মহাকাশ অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি

মাস্কের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের জন্য গত ২৮ সেপ্টেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক তৈরি হয়। সেদিন প্রতিষ্ঠানটির বিশাল স্টারশিপ রকেট প্রথমবারের মতো কক্ষপথে পৌঁছে ২৬টি স্টারলিংক স্যাটেলাইট স্থাপন করে। ইঞ্জিনের সমস্যার কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই অভিযান শেষ করতে হলেও কক্ষপথে পৌঁছানো ও স্যাটেলাইট স্থাপনের লক্ষ্য পূরণ হয়। <Cite refs={["turn922188news31","turn922188search3"]}/>

মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর মাস্কের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় স্টারশিপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা। তবে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য রকেটটির নির্ভরযোগ্যতা, পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা এবং নিয়মিত মহাকাশযাত্রার সক্ষমতা আরও উন্নত করতে হবে।

অন্যদিকে, স্টারলিংক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বিস্তারের পরিকল্পনাও স্পেসএক্সের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রযুক্তির পাশাপাশি ভূরাজনীতিতেও প্রভাব

মাস্কের প্রযুক্তি ব্যবসা এখন শুধু মহাকাশ কিংবা যোগাযোগ খাতে সীমাবদ্ধ নেই; আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তার আলোচনাতেও তাঁর প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা উঠে আসছে।

ইউক্রেনের পক্ষ থেকে তাদের সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার অভিযোগ তোলা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা যুদ্ধক্ষেত্রে বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা এবং তাদের সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এদিকে, একসময় টুইটার নামে পরিচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সও প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনায়ও প্ল্যাটফর্মটির উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনে ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক

মাস্কের ভাবমূর্তিতে বড় পরিবর্তনের একটি কারণ তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও ডানপন্থি রাজনীতির প্রতি সমর্থন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের উপহার দেওয়া একটি করাত হাতে তাঁর উপস্থিতি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

তখন ট্রাম্প প্রশাসনের সরকারি দক্ষতাবিষয়ক দপ্তর (ডিওজিই) পরিচালনায় মাস্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় কমানো এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কার্যক্রম পুনর্গঠনের উদ্যোগের প্রতীক হয়ে ওঠে ওই করাত।

ডিওজিইর কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সরকারি ব্যয় ও কর্মীসংখ্যা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর প্রভাব পড়ে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থায়; যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির কার্যক্রমও বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়ে। এসব পদক্ষেপের ফলে কর্মসংস্থান, সরকারি সেবার ধারাবাহিকতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

মাস্কের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টেও প্রযুক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি অভিবাসন, রাজনীতি ও বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয়ে তাঁর অবস্থান উঠে আসে। ফলে তাঁকে ঘিরে জনমত এখন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের বাইরেও বিস্তৃত।

ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলেছে

২০২৫ সালের মে মাসে ডিওজিই থেকে সরে দাঁড়ানোর পর ট্রাম্পের সঙ্গে মাস্কের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁদের সম্পর্ক আবার ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

গত ৮ অক্টোবর ট্রাম্প মাস্কের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল মেডেল অব সায়েন্স তুলে দেন। এ সময় তাঁকে ‘জাতীয় সম্পদ’ এবং ‘আমাদের সময়ের টমাস এডিসন’ বলে উল্লেখ করেন প্রেসিডেন্ট। <Cite refs={["turn922188news26","turn922188search0"]}/>

এই স্বীকৃতি মাস্কের প্রযুক্তিগত অবদানের প্রতি প্রশাসনের সমর্থন তুলে ধরলেও তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থেমে নেই।

নির্বাচনী রাজনীতিতে শতকোটি ডলারের ভূমিকা

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পক্ষে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে আবারও রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছেন মাস্ক। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই থেকে তিনি রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচার ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে ২৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছেন।

এর মধ্যে সিনেট লিডারশিপ ফান্ডে ১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং নিজের সংগঠন আমেরিকা পিএসিতে প্রায় ৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার দেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনেও তাঁর আর্থিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। <Cite refs={["turn922188news26","turn922188news27"]}/>

এ ধরনের বিপুল অর্থায়ন নির্বাচনী প্রচারে বড় দাতাদের প্রভাব, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং প্রযুক্তি খাতের ধনকুবেরদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

প্রামাণ্যচিত্রে উঠে এসেছে মাস্কের ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব

মাস্ককে ঘিরে ভিন্নমুখী মূল্যায়নের প্রতিফলন দেখা গেছে ‘মাস্ক’ নামের একটি চার ঘণ্টার প্রামাণ্যচিত্রে। অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা অ্যালেক্স গিবনি পরিচালিত ছবিটিতে দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া এই উদ্যোক্তার জীবন ও কর্মজীবন তুলে ধরা হয়েছে।

প্রামাণ্যচিত্রে মাস্কের প্রথম স্ত্রী জাস্টিন মাস্কের বক্তব্যও রয়েছে। পডকাস্টার কারা সুইশারের সঙ্গে আলাপে তিনি একসময় ইলনকে এমন ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, যিনি পাহাড়ের কিনারা থেকে ঝাঁপ দেওয়ার পর নিচে নামতে নামতেই প্যারাস্যুট আবিষ্কার করতে পারেন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যেও মাস্ক নিজের শক্তি খুঁজে পান। তবে তিনি মনে করেন, মাস্কের আপাত অপ্রত্যাশিত কর্মকাণ্ডের পেছনে কোনো পরিকল্পনা থাকতে পারে। তাঁর মতে, কিছু ঘটনা প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে দেওয়ার কৌশলও হতে পারে।

ব্যবসায়িক স্বার্থ ও রাজনৈতিক অবস্থানের সম্পর্ক

ওয়াশিংটনের সঙ্গে মাস্কের সম্পর্ক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তাঁর ব্যবসায়িক স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ। স্পেসএক্স নাসা ও পেন্টাগনের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় করে। একইভাবে, টেসলার রোবোট্যাক্সি প্রকল্পের সম্প্রসারণ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অনুমোদন ও নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।

এ কারণে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারে মাস্কের বিপুল অর্থ ব্যয়কে শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রকাশ হিসেবে দেখার পাশাপাশি তাঁর ব্যবসায়িক স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ইলন মাস্কের পরিচিতি এখন দুটি সমান্তরাল বাস্তবতায় গড়ে উঠছে। একদিকে মহাকাশ প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট যোগাযোগ ও বৈদ্যুতিক গাড়িতে তাঁর প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবন; অন্যদিকে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, সরকারি নীতিতে প্রভাব এবং নির্বাচনী অর্থায়ন নিয়ে বিতর্ক। এই দুই দিকই নির্ধারণ করছে জনপরিসরে মাস্ককে কীভাবে দেখা হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মেসির জোড়া গোলে মায়ামির জয়

1

পাঁচ ধাপে ইউপি নির্বাচন, ভোট শুরু ২১ জানুয়ারি

2

ঘুমের ঘাটতিতে বাড়ছে ক্যানসারের ঝুঁকি

3

সাত মাসেও ইশতেহার বাস্তবায়ন হয়নি, ডাকসু নিয়ে অসন্তোষ

4

হাম ও উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় ১২ শিশুর মৃত্যু

5

ব্রাজিলের খেলা দেখে ক্লান্তির কথা বললেন মির্জা ফখরুল

6

সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা

7

মন খুলে গান গাওয়া যায়, নাম্বার দেওয়া যায় না: শিক্ষামন্ত্রী

8

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হলেন ড. সাইমুম পারভেজ

9

ভুটান যাওয়ার পথে ঢাকায় ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো, সাক্ষাৎ বাফুফ

10

বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট-হেলমেট পরে এই গরমে মরেই যাবো : সালমান এফ

11

চীনের ২৩ খাতে সহযোগিতা প্রস্তাব, সফরে চুক্তির সম্ভাবনা

12

মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার কর্মী নেবে বিনা খরচে

13

ওমান উপকূলে তেলবাহী জাহাজে অগ্নিকাণ্ড, দুই নাবিক নিখোঁজ

14

ইরান যুদ্ধের আঁচে হুমকির মুখে ভারতের কাঁচ শিল্প

15

ইয়েমেন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি, সতর্ক ইসরায়েল

16

দেশ গঠনে ব্যক্তিগত উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী

17

মেসিকে নিয়ে ফুটবল কিংবদন্তিদের অমর উক্তি

18

হামে শিশু মৃত্যু ৭০০ ছাড়াল

19

মেট্রোরেলের চলাচলের সময় বাড়ল, রোববার থেকে নতুন সূচি

20