ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সুবিধা সম্প্রসারণে নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতা চেয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
একই সঙ্গে কৃষি, পাটশিল্প, জ্বালানি, বন্দর অবকাঠামো ও পানি ব্যবস্থাপনায় নেদারল্যান্ডসের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ কাজে লাগিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী স্যোয়ার্ড স্যোয়ার্ডসমার সঙ্গে বৈঠকে এসব বিষয় তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
বৈঠকে নেদারল্যান্ডসের পক্ষ থেকেও কৃষি ও শিল্পপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বন্দর অবকাঠামো এবং পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু ও গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। প্রচলিত বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং টেকসই বিনিয়োগের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা ও সম্ভাবনাময় বাজারের সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটানো গেলে উভয় দেশই লাভবান হতে পারে।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইউরোপ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার। তাই এ বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।
এ লক্ষ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারিগরি আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এবং শুল্কবহির্ভূত বাণিজ্যিক বাধা কমানোর বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বৈঠকে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নেদারল্যান্ডসের উন্নত বীজপ্রযুক্তি, গবেষণা এবং আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে আলু ও অন্যান্য সবজির উৎপাদনশীলতা ও গুণগত মান বাড়ানো, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্য উৎপাদন এবং নতুন বাজার তৈরিতে যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া সিলেটসহ সম্ভাবনাময় অঞ্চলগুলোতে বিশেষায়িত সবজি চাষ সম্প্রসারণ, কৃষকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে আধুনিক সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ায় বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের জন্য নতুন বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, উন্নত পাটবীজ উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, যৌথ গবেষণাগার স্থাপন এবং বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে নেদারল্যান্ডসের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ও মিশ্র তন্তুর কাপড় তৈরির মাধ্যমে পাটশিল্পে পণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রী স্যোয়ার্ড স্যোয়ার্ডসমা বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণ এবং সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেন। কৃষিপ্রযুক্তি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিল্পের আধুনিকায়ন, সামুদ্রিক পরিবহন ও পানি ব্যবস্থাপনায় নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এ ছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান সার কারখানাগুলোর আধুনিকায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ডাচ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান স্ট্যামিকার্বনের সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও বৈঠকে স্থান পায়।
বন্দর ব্যবস্থাপনা ও সামুদ্রিক পরিবহন খাতে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়েও আলোচনা করেন দুই মন্ত্রী। এ সময় লালদিয়া টার্মিনালসহ বন্দর উন্নয়ন, আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ডাচ প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত অংশগ্রহণ নিয়ে মতবিনিময় হয়।
পাশাপাশি নদী ও খাল খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনায় নেদারল্যান্ডসের গবেষণা সংস্থা ডেল্টারেসের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করা হয়।
নেদারল্যান্ডসের বিনিয়োগ আকর্ষণে মেধাস্বত্ব ও পেটেন্ট সুরক্ষা, কাস্টমস প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উন্নয়নের বিষয়েও দুই পক্ষ আলোচনা করে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনায় দক্ষতা বাড়ানো, তরুণ ও নারী কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় হয়।
বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত জোরিস ভ্যান বোমেলসহ উভয় দেশের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য করুন