মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন প্রেস সেক্রেটারি কেটি জাকারিয়ার আইনজীবী হিসেবে পেশাগত যোগ্যতা ও নিবন্ধন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। হোয়াইট হাউসের শীর্ষ মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার আইন পেশায় যুক্ত থাকার দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় নিবন্ধনের রেকর্ড খুঁজে পায়নি বার্তা সংস্থা রয়টার্স। বিষয়টি সামনে আসার পর তার পেশাগত পরিচয় ও পূর্ববর্তী কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সোমবার হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন জাকারিয়া। রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি আইন পেশায় কাজ করেছেন বলে দাবি করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও তাকে আইনজীবী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে রয়টার্সের অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্য কিংবা ওয়াশিংটন ডিসিতে তার আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধন বা বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদের রেকর্ড পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে তার পেশাগত পরিচয় নিয়ে এ প্রশ্ন সামনে এসেছে। এই নির্বাচন মার্কিন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অর্জন তুলে ধরা এবং কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সহায়তা করা প্রেসিডেন্টের অন্যতম লক্ষ্য।
কেটি জাকারিয়ার লিংকডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি চীনের বেইজিংয়ে ঝং লুন ল ফার্মে সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। পরে ২০২৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী রিক গ্রেনেলের প্রতিষ্ঠিত অধিকার আদায়ের সংগঠন ফিক্স ক্যালিফোর্নিয়ায় জেনারেল কাউন্সেল হিসেবে দায়িত্ব পালনের তথ্যও তার পেশাগত পরিচিতিতে উল্লেখ রয়েছে।
তবে ফিক্স ক্যালিফোর্নিয়ায় তার দায়িত্ব সম্পর্কে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন রিক গ্রেনেল। রয়টার্সকে পাঠানো এক খুদে বার্তায় তিনি জানান, জাকারিয়া মূলত একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। বিভিন্ন দায়িত্বের মধ্যে সংগঠনের বাইরের আইনজীবীদের নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টিও ছিল।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঝং লুন ল ফার্মকে ই-মেইল করলেও রয়টার্স কোনো উত্তর পায়নি। একইভাবে হোয়াইট হাউসও জাকারিয়ার আইন পেশার অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা নিয়ে পাঠানো প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
বুধবার ই-মেইলে দেওয়া এক বিবৃতিতে জাকারিয়া বলেন, ‘আমি আন্তর্জাতিক লেনদেনবিষয়ক আইন নিয়ে কাজ করেছি এবং এ জন্য প্রয়োজনীয় সব যোগ্যতা আমার ছিল।’
ট্রাম্প প্রশাসনের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর নিয়ে অসন্তোষের কারণে নতুন প্রেস সেক্রেটারি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দুজন ব্যক্তি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশাসনের অর্জন আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে একজন নতুন মুখপাত্র প্রয়োজন বলে মনে করেছিলেন ট্রাম্প।
এর আগে গত আগস্টে হোয়াইট হাউস ছাড়েন সাবেক প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট। তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে জাকারিয়ার নিয়োগ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের এত কাছাকাছি সময়ে হওয়ায় হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মকর্তাও বিস্মিত হয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন একজন কর্মকর্তা।
নতুন দায়িত্বে যোগ দেওয়ার পর জাকারিয়ার প্রথম সংবাদ সম্মেলনও আলোচনার জন্ম দেয়। মঙ্গলবারের ওই ব্রিফিংয়ে মাত্র তিনজন সাংবাদিকের প্রশ্ন নেওয়ার পর ১৫ মিনিটেরও কম সময়ে সংবাদ সম্মেলন শেষ করেন তিনি। তার এ পদক্ষেপের সমালোচনা করেন কয়েকজন সংবাদমাধ্যম বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক।
তবে জাকারিয়ার সংবাদ সম্মেলন নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেন ট্রাম্প। সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়েছে, সে খুব ভালো করেছে।’
পেপারডাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন জাকারিয়া। তবে যুক্তরাষ্ট্রে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনজীবী হিসেবে কাজ করার অনুমতি পাওয়া যায় না। সাধারণত সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং নির্ধারিত পেশাগত শর্ত পূরণ করে নিবন্ধিত হতে হয়।
মঙ্গলবার এক সাংবাদিক জাকারিয়াকে প্রশ্ন করেন, তিনি কোথায় বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি যখন চীনে গিয়েছিলাম।’
তার এ উত্তর নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ, চীনে আইনসংক্রান্ত কাজে যুক্ত থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রে আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধিত হওয়া দুটি আলাদা বিষয়। কোনো আইন প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও তা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধনের বিষয়টি নিশ্চিত করা যায় না।
চীনের আইন অনুযায়ী, দেশটিতে আইনজীবী হিসেবে সরাসরি পেশাগত চর্চা করার জন্য চীনা নাগরিকত্বসহ নির্ধারিত যোগ্যতা প্রয়োজন। বিদেশিরা আইনসংক্রান্ত পরামর্শ ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করতে পারলেও দেশটিতে স্থানীয় আইনজীবীর মতো সরাসরি পেশাগত চর্চা করতে পারেন না।
কেটি জাকারিয়ার পেশাগত পরিচয় নিয়ে বিতর্ককে জনগণের আস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় হিসেবে দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও আইনগত নৈতিকতা বিশেষজ্ঞ রেনে নেকে জেফারসন বলেন, বিষয়টি ‘জনগণের আস্থার একটি মৌলিক বিষয়’। তার মতে, এটি কেবল পেশাগত পরিভাষা নিয়ে বিতর্ক নয়।
জেফারসন বলেন, হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি হতে আইনজীবী হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। তবে কোনো সরকারি কর্মকর্তা এমন একটি পেশাগত পরিচয়ের দাবি করছেন কি না, যা তার নেই বলে অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে জনগণের সঠিক তথ্য জানার অধিকার রয়েছে।
অর্থাৎ, প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য আইনজীবীর সনদ অপরিহার্য না হলেও নিজের পেশাগত যোগ্যতা ও পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা সম্পর্কে দেওয়া তথ্যের যথার্থতা গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই জাকারিয়ার আইনজীবী পরিচয় নিয়ে ওঠা প্রশ্ন রাজনৈতিক ও পেশাগত আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর আরেকটি ঘটনায় আলোচনায় আসেন কেটি জাকারিয়া। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি মুখ ফসকে নিজের স্বামীকে ‘প্রেসিডেন্ট’ বলে সম্বোধন করেন। পরে ভুল বুঝতে পেরে তা সংশোধন করেন। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে হাস্যরসের পাশাপাশি বিতর্কও তৈরি হয়।
চার সন্তানকে লালনপালনের পাশাপাশি নতুন দায়িত্ব কীভাবে সামলাবেন—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে জাকারিয়া পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া সমর্থনের কথা তুলে ধরছিলেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘প্রথমেই আমি আমার স্বামীকে আন্তরিক সাধুবাদ জানাতে চাই।’ এরপরই তিনি বলেন, ‘আমার প্রেসিডেন্ট, মাফ করবেন, আমার স্বামী, এটা ভালো কৌতুক ছিল।’
তার এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ ঘটনাটিকে নিছক কথার ভুল হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ নতুন প্রেস সেক্রেটারির বক্তব্য ও জনসমক্ষে উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
সব মিলিয়ে, কেটি জাকারিয়াকে ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে তার আইন পেশার অভিজ্ঞতা, পেশাগত যোগ্যতা সম্পর্কে দেওয়া বক্তব্য এবং হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র হিসেবে তার প্রাথমিক কার্যক্রম। তবে যুক্তরাষ্ট্রে আইনজীবী হিসেবে তার নিবন্ধন নিয়ে প্রশ্ন ওঠা মানেই তিনি আইন পেশায় কোনো অভিজ্ঞতা অর্জন করেননি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ বিষয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, পূর্ববর্তী কাজের প্রকৃতি এবং প্রাসঙ্গিক পেশাগত নথি সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন