যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বক্তব্য দিতে মঞ্চে ওঠার পরপরই ইরানি প্রতিনিধিদল কক্ষ ত্যাগ করে। তবে ইরানি প্রতিনিধিদের জন্য নির্ধারিত আসনে রেখে যায় দেশটির সাবেক সামরিক কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলাইমানির ছবি।
জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ডানন ইরানি প্রতিনিধিদলের কাছে থাকা সোলাইমানির ছবির উপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ছবিটি সেখানে কেন রাখা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্নও তোলেন তিনি। পরে নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে ডানন ইরানি প্রতিনিধিদলের টেবিলের কাছে গিয়ে সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তিকে দৃশ্যটি ধারণ করতে বলেন এবং দাবি করেন, তিনি ইরানকে একটি উপহার দিতে চান।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি বলছে, নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় ইরানি প্রতিনিধিদল কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর সোলাইমানির ছবিটি ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানের আসনে রেখে যায়।
পরবর্তীতে এ বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ ঘটনাকে সোলাইমানির উত্তরাধিকার ও ইরানের অবস্থানের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘একজন কমান্ডারের মৃত্যু তার অনুসৃত নীতি, স্বার্থ ও অবস্থান পরিত্যাগের অর্থ নয়।’
বাঘায়ি তার পোস্টের শুরুতে পারস্যের মহাকাব্য ‘শাহনামা’র কয়েকটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করেন। ফেরদৌসী রচিত এই মহাকাব্যে কিংবদন্তি ইরানি রাজপুত্র সিয়াভাশের মৃত্যুর প্রসঙ্গ রয়েছে।
বাঘায়ি সিয়াভাশের স্মৃতির সঙ্গে সোলাইমানির হত্যার তুলনা করে বলেন, ‘কোনো বীরকে হত্যা করলেই তার উপস্থিতি বা তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আদর্শ মুছে যায় না; বরং তার স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় অধিকাংশ প্রতিনিধি কক্ষ ছেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ইরানি প্রতিনিধিদলও বেরিয়ে যায় এবং সোলাইমানির ছবিটি সেখানে রেখে আসে।’
ওই ছবিটি রেখে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ইরান সোলাইমানির মর্যাদা ও তার উত্তরাধিকারের স্থায়িত্বের বিষয়টি তুলে ধরেছে। বাঘায়ির ভাষ্য মতে, ছবিটি সেখানে রেখে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল সোলাইমানির উপস্থিতির প্রতীককে আরো স্পষ্ট করা এবং ইরানের প্রতিপক্ষদের প্রতি একটি বার্তা দেওয়া যে তার মৃত্যুর পরও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবস্থান ও আদর্শ থেকে ইরান সরে যায়নি।
প্রসঙ্গত, জেনারেল সোলাইমানি ইরানের অভিজাত কুদস ফোর্সের সাবেক কমান্ডার ছিলেন।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বৈদেশিক অভিযান পরিচালনা করত এই বাহিনী। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন ড্রোন হামলায় জেনারেল সোলাইমানি নিহত হন। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এদিকে নেতানিয়াহু বক্তব্য শুরু করার সময় ইরানি প্রতিনিধিদের পাশাপাশি আরো কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিও কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। কেউ কেউ নেতানিয়াহুকে দুয়োধ্বনি দেন। অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা প্রতিনিধিরা দাঁড়িয়ে তাকে করতালি দেন। এ সময় কক্ষ ছেড়ে যাওয়া প্রতিনিধিদের উদ্দেশে পরে নেতানিয়াহু বলেন, ‘যেসব নৈতিক কাপুরুষ এখনো হল ছাড়েননি, দয়া করে তারাও বেরিয়ে যান।’
ভাষণে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সমালোচনাকারী কয়েকটি দেশ ও নেতারও সমালোচনা করেন। ইরানকে ‘হত্যাকারী স্বৈরশাসন’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নিয়েছে।’
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকেও ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ বলে আক্রমণ করেন নেতানিয়াহু। তার নির্বাচনের পর শহরে অনেক ইহুদি নিজেদের আর নিরাপদ মনে করছেন না বলেও দাবি করেন তিনি। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানেরও সমালোচনা করে তাকে ‘স্বৈরশাসক’ বলেন নেতানিয়াহু এবং হামাসকে সমর্থনের অভিযোগ তোলেন।