ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে মতপার্থক্য এবং রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল আমদানি নিয়ে ওয়াশিংটনের অসন্তোষের মধ্যেই আগামী সপ্তাহে ভারত সফরে যাচ্ছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। এ সফরে দুই দেশের জ্বালানি সহযোগিতা, কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) জানিয়েছে, ভারত সফরের আগে রুবিও উজবেকিস্তানের সমরকন্দে যাবেন। সেখানে মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সি৫+১’ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন তিনি। এরপর ভারতের মুম্বাই ও গুজরাটের জামনগর সফর করবেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
গত মে মাসে নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের আয়োজনে কোয়াডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন রুবিও। আগামী সপ্তাহের সফরটি হবে ওই সফরের পর ভারতে তার দ্বিতীয় সফর।
ভারতে অবস্থানকালে দেশটির জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এসব আলোচনায় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদারত্ব, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং জ্বালানি খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে দুই দেশের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গেও আলোচনা করার কথা রয়েছে তার।
রুবিওর ভারত সফরের ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দুই দেশের চলমান বাণিজ্য আলোচনা ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরামে ব্লুমবার্গ নিউজের প্রধান সম্পাদক জন মিকলথওয়েটের সঙ্গে আলোচনায় জয়শঙ্কর বলেন, তার ধারণা, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক মতপার্থক্য নিরসনের বিষয়টি সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
জয়শঙ্করের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে নিজেদের শিল্প খাতের কাঠামো নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি কোন শর্তে অন্যান্য দেশ মার্কিন বাজারে প্রবেশ করতে পারবে, সে বিষয়েও নতুন নিয়ম নির্ধারণের চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।
তিনি ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য বাণিজ্যিক অংশীদারের সঙ্গে যেসব শর্তে চুক্তি করছে, সেগুলোর সঙ্গে তুলনা করেই প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়গুলো মূল্যায়ন করছে ভারত। অর্থাৎ, শুধু দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা নয়, অন্যান্য দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ব্যবস্থাও ভারতের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জয়শঙ্কর বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে সাজিয়েছে।’ তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের পরিবর্তিত নীতি ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অন্যান্য দেশকেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কের হিসাব নতুন করে করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের শর্তগুলো পুনর্বিবেচনা করাও প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আলোচনায় শুল্ক, বাজারে প্রবেশের সুযোগ এবং মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত বাণিজ্যনীতির কারণে এসব বিষয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশাধিকার এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সুবিধা নির্ধারণের ক্ষেত্রে চুক্তির শর্তগুলো ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, নিজেদের শিল্প খাতকে শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়ম নতুনভাবে সাজানো যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অগ্রাধিকারের অংশ।
এ পরিস্থিতিতে ভারত প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তির শর্তগুলো অন্যান্য দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির তুলনায় বিচার করে এগোতে চাইছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা কত দ্রুত এবং কোন শর্তে চূড়ান্ত হবে, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
বাণিজ্যিক মতপার্থক্যের পাশাপাশি রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনার বিষয়টিও দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার তেল আমদানি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তোষের কারণে জ্বালানি নীতি ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা নিয়ে আলোচনায় সংবেদনশীলতা রয়েছে।
আসন্ন সফরে জ্বালানি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়টি আলোচনার অন্যতম ক্ষেত্র হলেও রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে বিদ্যমান মতপার্থক্য কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের মতো বিষয়গুলো দুই দেশের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, মার্কো রুবিওর আসন্ন ভারত সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন দুই দেশ একদিকে বাণিজ্যিক সমঝোতার পথ খুঁজছে, অন্যদিকে জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক নীতির বিভিন্ন প্রশ্নে মতপার্থক্য সামলাতে হচ্ছে। ফলে এই সফর ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বাণিজ্য চুক্তির চূড়ান্ত অগ্রগতি এবং রাশিয়ার তেল নিয়ে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে কতটা সমন্বয় তৈরি হয়, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।
মন্তব্য করুন