অনলাইন নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মহাকাশে যুদ্ধের আশঙ্কা, সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে পরাশক্তিরা

আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মহাকাশে যুদ্ধের আশঙ্কা, প্রস্তুতি নিচ্ছে পরাশক্তিরা

স্থল, জল ও আকাশের পর এবার পৃথিবীর কক্ষপথও বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মহাকাশে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন সামরিক ও মহাকাশ নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। এ আশঙ্কার মধ্যে নিজেদের কৃত্রিম উপগ্রহ সুরক্ষিত রাখতে বেসামরিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রতিরক্ষা প্রকল্পে যুক্ত করছে যুক্তরাজ্য।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের ১৭ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহাকাশে উপগ্রহের সংখ্যা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা, নজরদারি ও বাধা সৃষ্টির ঝুঁকিও বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে মহাকাশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশ নতুন প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরিতে গুরুত্ব দিচ্ছে।

বেসামরিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও যুক্ত হচ্ছে প্রতিরক্ষা প্রকল্পে

মহাকাশের আবর্জনা অপসারণের প্রযুক্তি তৈরির উদ্দেশ্যে ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান অ্যাস্ট্রোস্কেল। তবে মহাকাশে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়তে থাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তি এখন সামরিক প্রকল্পেও ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যাস্ট্রোস্কেল যুক্তরাজ্যের কয়েকটি গোপন সামরিক প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে। এসব প্রকল্পের লক্ষ্য মহাকাশে সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করা এবং বিপজ্জনক উপগ্রহের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ বা মোকাবিলার প্রযুক্তি তৈরি করা।

এদিকে মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহে জ্বালানি সরবরাহের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান অরবিট ফ্যাবও যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছে। মহাকাশযানের কাছাকাছি গিয়ে অবস্থান নেওয়া, চলাচল এবং প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের মতো প্রযুক্তি ভবিষ্যতে উপগ্রহের নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

অ্যাস্ট্রোস্কেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিক শেভের ভাষ্য, একসময় মহাকাশে উপগ্রহ পরিচালনার ক্ষেত্রে হামলার আশঙ্কা তুলনামূলক কম গুরুত্ব পেত। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। ফলে নিজেদের মহাকাশসম্পদ রক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠেছে।

উপগ্রহ অচল হলে বিপর্যস্ত হতে পারে দৈনন্দিন জীবন

আধুনিক বিশ্বের যোগাযোগ, নেভিগেশন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পরিচালনায় কৃত্রিম উপগ্রহের ভূমিকা অপরিহার্য। তাই মহাকাশে বড় ধরনের হামলা হলে তার প্রভাব পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পড়তে পারে।

উপগ্রহের যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে টেলিভিশন সম্প্রচার, কিছু ইন্টারনেট সেবা, বিমান চলাচলের নির্দিষ্ট ব্যবস্থা এবং সামরিক যোগাযোগ ব্যাহত হতে পারে। জিপিএস ও অন্যান্য স্যাটেলাইটভিত্তিক নেভিগেশন ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিলে পরিবহন, জাহাজ চলাচল এবং সময়-সমন্বয়নির্ভর আর্থিক ব্যবস্থাও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

তবে সব উপগ্রহ একসঙ্গে অচল হয়ে পড়বে কিংবা বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ও ব্যাংকব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে—এমনটি নিশ্চিত নয়। ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে হামলার ধরন, আক্রান্ত উপগ্রহের সংখ্যা এবং বিকল্প ব্যবস্থার সক্ষমতার ওপর।

রাশিয়ার উপগ্রহ নিয়ে উদ্বেগ

মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা নিয়ে উদ্বেগের অন্যতম কারণ রাশিয়ার কিছু উপগ্রহ কর্মসূচি। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া কসমস-২৫৫৩ নামের একটি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে। মার্কিন কর্মকর্তারা ও বিশ্লেষকেরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, উপগ্রহটি ভবিষ্যতে মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কোনো কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

তবে কসমস-২৫৫৩ নিজেই পারমাণবিক অস্ত্র বহন করছে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাশিয়া উপগ্রহটিকে গবেষণামূলক কাজে ব্যবহারের কথা বলেছে।

মহাকাশে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটলে তার বিকিরণ পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা বহু উপগ্রহের ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর ফলে যোগাযোগ ও নেভিগেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবা দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মহাকাশের পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

চীনের মহাকাশযান নিয়েও নজরদারি

চীনের মহাকাশ কর্মসূচি নিয়েও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। চীনের চালকবিহীন শেনলং স্পেস প্লেনের মতো মহাকাশযান কক্ষপথে দীর্ঘ সময় অবস্থান ও বিভিন্ন কৌশলগত চালচলন পরিচালনার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।

কক্ষপথে একটি উপগ্রহের খুব কাছাকাছি গিয়ে অবস্থান নেওয়া বা অন্য মহাকাশযানের সঙ্গে জটিল কৌশলগত চলাচল পরিচালনার প্রযুক্তি বেসামরিক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। একই প্রযুক্তি সামরিক উদ্দেশ্যেও কাজে লাগতে পারে। যেমন—অন্য উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ করা, তার কার্যক্রমে বাধা দেওয়া কিংবা সেটিকে অচল করার চেষ্টা।

তবে এ ধরনের সক্ষমতা থাকা মানেই কোনো দেশ অবিলম্বে অন্য দেশের উপগ্রহে হামলা চালাবে, এমন নয়। মহাকাশে সামরিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের বড় কারণ হলো, একই প্রযুক্তি শান্তিপূর্ণ ও সামরিক—দুই ধরনের কাজেই ব্যবহৃত হতে পারে।

মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

মহাকাশের সামরিকীকরণ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও নতুন সক্ষমতার কথা প্রকাশ করেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন বিমানবাহিনীর সচিব ট্রয় মেইঙ্ক জানান, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কক্ষপথে মোতায়েন করা ‘স্পেস কন্ট্রোল’ অস্ত্র রয়েছে, যা সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের হুমকি মোকাবিলায় ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে অস্ত্রগুলোর প্রকৃতি, কার্যপ্রণালি কিংবা সুনির্দিষ্ট সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা এগুলোকে নিজেদের বাহিনীকে শত্রুভাবাপন্ন কর্মকাণ্ড থেকে সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এ ধরনের ঘোষণার ফলে মহাকাশে প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

মহাকাশ নিরাপত্তায় বিশেষ ইউনিট গঠন যুক্তরাজ্যের

মহাকাশে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির রয়্যাল এয়ার ফোর্স একটি বিশেষ স্পেস স্কোয়াড্রন গঠন করেছে, যার অন্যতম দায়িত্ব হবে যুক্তরাজ্যের মহাকাশসম্পদ সুরক্ষায় সহায়তা করা।

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের মতে, মহাকাশে প্রতিপক্ষের কর্মকাণ্ড আরও দ্রুত ও জটিল হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে মহাকাশে নজরদারি, হুমকি শনাক্তকরণ এবং উপগ্রহ সুরক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

একই সঙ্গে ইউরোপের বিভিন্ন মহাকাশ কর্মসূচিতেও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। বেসামরিক প্রযুক্তি ও সামরিক প্রয়োগের মধ্যে ব্যবধান কমে আসায় মহাকাশ গবেষণার প্রকল্পগুলোতে নিরাপত্তা পরিকল্পনা যুক্ত করার প্রবণতা বাড়ছে।

সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জরুরি

মহাকাশে উপগ্রহ ধ্বংসের ঘটনা শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের ক্ষতি করবে না; এর প্রভাব অন্য দেশের উপগ্রহ ও সেবার ওপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে উপগ্রহ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে কোনো উপগ্রহ ধ্বংস করা হলে তৈরি হওয়া ধ্বংসাবশেষ দীর্ঘ সময় কক্ষপথে ঘুরে অন্য মহাকাশযানের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এ কারণে মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিয়ম, স্বচ্ছতা এবং সংঘাত এড়ানোর ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৭ সালের আউটার স্পেস ট্রিটি মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্রসহ গণবিধ্বংসী অস্ত্র স্থাপন নিষিদ্ধ করেছে। তবে প্রচলিত সব ধরনের সামরিক সক্ষমতার ওপর একই ধরনের সার্বিক নিষেধাজ্ঞা নেই।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা মহাকাশে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী—এমন ঘোষণা নয়। বরং কক্ষপথে বাড়তে থাকা সামরিক সক্ষমতা, উপগ্রহের ওপর নির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে—সেই সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করছে। মহাকাশকে শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার অব্যাহত রাখতে প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগও তাই গুরুত্বপূর্ণ।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হবিগঞ্জে ছাত্রনেতা মাহদীর ওপর হামলা, হাসপাতালে ভর্তি

1

হঠাৎ দেশের আকাশে বিরল মহাজাগতিক দৃশ্য

2

মিনায় হজযাত্রীদের জন্য তাঁবু তৈরির কাজ শুরু

3

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নে সম্মত ইউরোপীয় ইউনিয়

4

‘তুমি সারা বিশ্বের লাখো শিশুর অনুপ্রেরণা’, মেসির অবসরে বেকহ্

5

কিংবদন্তি হকি খেলোয়াড় আবদুস সাদেক আর নেই

6

যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক হামলায় ৮ শিশু নিহত

7

ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হারের পর ভারতীয় ব্যাটারদের তুলোধুনা করল

8

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৈরিতায় বাড়ল তেলের দাম

9

কখনো ভাবিনি, এমন একটা সময় আসবে: সামিয়া আফরিন

10

ম্যাচের আগে তীব্র গরম নিয়ে স্বস্তির খবর আর্জেন্টিনা শিবিরে

11

রান নেই–উইকেট নেই, তবু ম্যাচসেরা

12

দীর্ঘতম মোতায়েন শেষে ফিরছে ইউএসএস ফোর্ড

13

তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানালেন জামায়াত আ

14

হরমুজ প্রণালীতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘর্ষ: যুদ্ধবিরতি বহালের

15

বিশ্বকাপে বাজির বাজার ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানোর পূর্বাভাস

16

শুক্র ও শনিবার হজ-সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখা খোলা রাখার নির্দেশ

17

দীর্ঘ বিরতির পর খুলছে ইরানের শেয়ারবাজার

18

লালমনিরহাট সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি যুবক নিহত

19

জামালপুরের কোরবানির পশুর হাটে মহিষের আক্রমণে নিহত ২

20