পণ্যের দাম নিয়ে দর–কষাকষি, গ্রাহকের অভিযোগের সমাধান কিংবা চাকরির ক্ষেত্রে ভালো বেতনের প্রস্তাব আদায়—এমন নানা কাজে মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এজেন্ট। এই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে এমন প্রযুক্তি তৈরির বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। তবে এ ধরনের এজেন্ট যেন দর–কষাকষির সময় আইনি ও নৈতিক সীমা অতিক্রম না করে, তা নিশ্চিত করতে আইনজীবীদের পরামর্শ নেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
এআই প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এমন একটি ব্যবস্থার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, যেখানে একজন ব্যবহারকারীর এআই এজেন্ট অন্য পক্ষের এআই এজেন্টের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে চুক্তির শর্ত ঠিক করতে পারবে। এতে প্রতিটি ধাপে মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণের প্রয়োজন কমে আসতে পারে। তবে দুই পক্ষের স্বার্থ রক্ষায় নিয়োজিত এজেন্টগুলো নিজেদের ব্যবহারকারীর জন্য সবচেয়ে ভালো চুক্তি আদায়ের চেষ্টা করলে আলোচনা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক ব্লগ পোস্টে অ্যানথ্রপিক জানায়, বাস্তব পরিস্থিতির আদলে তৈরি বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে এআই এজেন্টের দর–কষাকষির দক্ষতা যাচাই করেছে তারা।
পরীক্ষায় কর্মীরা একটি ভার্চ্যুয়াল বাজারে এআই এজেন্ট ব্যবহার করে বই কেনাবেচা করেন। এতে দেখা যায়, কঠোরভাবে দর–কষাকষি করার নির্দেশনা পাওয়া এজেন্টগুলো তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো চুক্তি করতে পেরেছে। অন্যদিকে, সহযোগিতামূলক আচরণে অভ্যস্ত এজেন্টগুলো কখনো কখনো নিজেদের কম পছন্দের বই গ্রহণ করেছে, যাতে লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রত্যেক পক্ষই কিছু সুবিধা পায়।
এই পরীক্ষার ফলাফল থেকে বোঝা যায়, এআই এজেন্টের আচরণ অনেকটাই নির্ভর করতে পারে তাকে দেওয়া নির্দেশনা এবং দর–কষাকষির কৌশলের ওপর। তবে বাস্তব জীবনের জটিল চুক্তিতে একই ধরনের ফল পাওয়া যাবে কি না, তা আরও যাচাইয়ের বিষয়।
দর–কষাকষির দক্ষতার পাশাপাশি এআই এজেন্টের সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়েও গবেষণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের সহকারী অধ্যাপক মিশেল ভাকারো এআই এজেন্টগুলোর মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি দর–কষাকষি নিয়ে গবেষণা করেছেন। এসব পরীক্ষায় চাকরির প্রস্তাব ও বাড়িভাড়ার চুক্তির মতো পরিস্থিতিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, এআই এজেন্ট প্রম্পট ইনজেকশনের মতো কৌশল ব্যবহার করে অন্য এজেন্টকে বিভ্রান্ত করতে পারে এবং তার কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য বের করে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। প্রম্পট ইনজেকশন হলো বিশেষভাবে তৈরি নির্দেশনার মাধ্যমে এআই ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে অনাকাঙ্ক্ষিত কাজ করানোর একটি কৌশল।
এ ধরনের ঝুঁকি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, কারণ এআই এজেন্ট যদি মানুষের হয়ে গোপনীয় তথ্য ব্যবহার করে আলোচনা চালায়, তাহলে অসতর্কতা বা কৌশলী আক্রমণের কারণে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ও স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এআই এজেন্টের বিস্তৃত ব্যবহার দর–কষাকষিতে নতুন ধরনের বৈষম্যও তৈরি করতে পারে। উন্নত এআইয়ের সহায়তায় সাধারণ মানুষ পেশাদার পরামর্শকের সাহায্য ছাড়াই চাকরির বেতন, বাড়িভাড়া কিংবা পণ্য কেনার ক্ষেত্রে নিজেদের জন্য ভালো শর্ত আদায়ের সুযোগ পেতে পারেন।
তবে সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেলগুলো যদি মূলত ধনী ব্যক্তি ও বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাগালে থাকে, তাহলে তারাই দর–কষাকষিতে বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। বিপরীতে, আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষ এবং ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় আরও অসুবিধায় পড়তে পারে।
অর্থাৎ, এআই এজেন্ট একদিকে দর–কষাকষির সুযোগ আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে, অন্যদিকে উন্নত প্রযুক্তিতে অসম প্রবেশাধিকার থাকলে বিদ্যমান বৈষম্যও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বর্তমানে মানুষের হয়ে দর–কষাকষি ও লেনদেন পরিচালনাকারী এআই এজেন্টের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে সুস্পষ্ট আইনি ও নীতিগত কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে, এ ধরনের এজেন্ট কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, কোন পরিস্থিতিতে সমঝোতা করবে এবং কখন মানুষের অনুমতি বা সহায়তা চাইবে—এসব বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি।
এআই এজেন্টের সিদ্ধান্তের কারণে আর্থিক ক্ষতি হলে দায় কার ওপর বর্তাবে, ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে এবং কোনো চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে ব্যবহারকারীর সম্মতি কখন প্রয়োজন হবে, সেসব প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে।
মানুষের হয়ে দর–কষাকষি করতে সক্ষম এআই এজেন্ট ভবিষ্যতে কেনাকাটা, চাকরি ও ব্যবসায়িক চুক্তির প্রক্রিয়া বদলে দিতে পারে। তবে এর সুবিধা যেন নিরাপত্তা, জবাবদিহি ও ন্যায্যতার বিনিময়ে অর্জিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি কার্যকর আইনি ও নীতিগত সুরক্ষাও প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন