
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে ‘জার্মান ক্লাব’ নামে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে অবৈধ মদ-বিয়ার বিক্রি ও ডিজে পার্টির আয়োজনের অভিযোগ উঠেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (নারকোটিক্স) অভিযানে আমদানি নিষিদ্ধ বিদেশি মদ-বিয়ার, পার্টির টিকিট, আর্থিক লেনদেনের নথি এবং মাদক সেবনের বিভিন্ন উপকরণ জব্দ করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো। এসব অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি অতিথিদের পাশাপাশি ধনাঢ্য পরিবারের কিছু তরুণও অংশ নিতেন। তবে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জার্মানির কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছে নারকোটিক্স।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৬ অক্টোবর রাত আড়াইটার দিকে গুলশানের কথিত জার্মান ক্লাবে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নেয় নারকোটিক্সের একটি দল।
অভিযানসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সেখানে পৌঁছে প্রধান ফটক ভেতর থেকে তালাবদ্ধ দেখতে পান। বারবার দরজা খোলার অনুরোধ করা হলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। একপর্যায়ে পেছনের দরজা দিয়ে কয়েকজন তরুণ-তরুণীকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। পরে অভিযানকারী দলের সদস্যরা ওই দরজা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে প্রবেশ করেন।
ভেতরে গিয়ে জমকালো আলোকসজ্জা ও ‘নোভা নাইটস’ নামে একটি ডিজে পার্টির আয়োজন দেখতে পান তাঁরা। বিভিন্ন জায়গায় স্তূপ করে রাখা ছিল বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ ও বিয়ার।
টানা তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা তল্লাশিতে এসব পানীয়ের পাশাপাশি ডিজে পার্টির টিকিট, ব্যাংক লেনদেনের রসিদ এবং মাদক সেবনের বিভিন্ন উপকরণ জব্দ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযানের সময় প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি সরে পড়েন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। তবে প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার আতাউর রহমান শামীমকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অবৈধ মদের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে নারকোটিক্স। তাঁদের মধ্যে ওমর জামিল, যিনি ‘জুডো’ বা ‘ডিজে জুডো’ নামেও পরিচিত, তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ডিজে পার্টি আয়োজনের সঙ্গে জুডো, আয়ান ও ডিজে সুমন নামের কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে জুডো ও আয়ানের বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় নারকোটিক্সের সহকারী পরিচালক মোস্তাক আহমেদ বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলা করেছেন। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না।
অভিযানসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কথিত জার্মান ক্লাবে আয়োজিত ডিজে পার্টির টিকিট বিক্রি হতো ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকায়।
এসব অনুষ্ঠানে বিদেশি অতিথিরা অংশ নিলেও অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। ধনাঢ্য পরিবারের কিছু তরুণও নিয়মিত এসব পার্টিতে আসতেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, জব্দ করা টিকিট ও আর্থিক লেনদেনের নথি থেকে অনুষ্ঠান আয়োজন এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুলশান-১ এলাকায় অবস্থিত এসটিএল বা সাবের ট্রেডার্স লিমিটেড নামের একটি শুল্কমুক্ত মদের দোকান থেকে কথিত জার্মান ক্লাবের জন্য গোপনে মদের চালান আনা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে চালান পরিবহনের সময় হলুদ নম্বরপ্লেটযুক্ত গাড়ি ব্যবহার করা হতো বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে মদের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তদন্তের ফলাফল প্রয়োজন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুলশান-২-এর ১০৪ নম্বর সড়কের ২৪ নম্বর বাড়িতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সন্ধান পাওয়া যায়। বাড়িটির এক পাশে বড় অক্ষরে ‘৭৮ রেস্ট হাউজ সোসাইটি’ লেখা ছিল এবং ভেতরে জার্মানির পতাকা টাঙানো দেখা যায়।
প্রতিষ্ঠানটির দুটি ভারী ফটক ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। একটি দরজায় নির্মাণকাজের জন্য ক্লাবের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার নোটিশ ঝুলছিল। দরজায় যোগাযোগ করলে এক নিরাপত্তাকর্মীও প্রতিষ্ঠানটি সাময়িকভাবে বন্ধ বলে জানান।
ক্লাবের ওয়েবসাইটে যোগাযোগের জন্য দেওয়া মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ল্যান্ডফোনে কল করা হলেও কেউ উত্তর দেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নারকোটিক্সের দাবি, ‘জার্মান ক্লাব’ নাম ব্যবহার করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জার্মানির কোনো সম্পর্ক নেই। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশি ক্লাবের সাইনবোর্ডের আড়ালে সেখানে অবৈধ মদের বার পরিচালনা করা হতো এবং এর সঙ্গে স্থানীয় একটি চোরাকারবারি চক্র জড়িত।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জার্মান দূতাবাসও প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে অবগত নয়। তবে এ বিষয়ে দূতাবাসের সরাসরি বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির সামনে পুলিশি নিরাপত্তা চৌকি থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (কূটনৈতিক নিরাপত্তা বিভাগ) আজাদ রহমান যুগান্তরকে বলেন, ওই ক্লাবকে কেন্দ্র করে পুলিশ কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা দেয়নি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এলাকায় কূটনীতিক ও বিদেশি নাগরিকদের যাতায়াত থাকায় তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশি চৌকি স্থাপন করা হয়েছিল।
নারকোটিক্স জানিয়েছে, তদন্তের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক ও সিসিটিভি ক্যামেরার ডিভিআর জব্দ করা হয়েছে। এসব ডিজিটাল ডিভাইসের তথ্য পরীক্ষা করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম, আর্থিক লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে আরও তথ্য জানার চেষ্টা চলছে।