
চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৫৯ জনই বিদেশি নাগরিক। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় বাংলাদেশের নাগরিকও রয়েছেন। ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের (ইএসওএইচআর) প্রকাশিত পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের প্রথমার্ধে সৌদি আরবে কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ৫৪ শতাংশই ছিল বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে, একই সময়ে ৪৯ জন সৌদি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
ইএসওএইচআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিরা ১৭টি দেশের নাগরিক। সৌদি আরবের নাগরিকদের পাশাপাশি তালিকায় রয়েছেন বাংলাদেশ, ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান, ইয়েমেন, সিরিয়া, জর্ডান, সোমালিয়া, মিসর, নাইজেরিয়া, বেনিন, ইরাক, কুয়েত, কেনিয়া, উগান্ডা ও আফগানিস্তানের নাগরিকেরা।
সংস্থাটির পরিসংখ্যান বলছে, সৌদি আরবে বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উচ্চ হার অব্যাহত রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাটি এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে।
অপরাধের ধরন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিসংখ্যান হলো—
মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধ: ৭১ জন, মোট সংখ্যার প্রায় ৬৬ শতাংশ।
হত্যাকাণ্ড: ২৫ জন, প্রায় ২৩ শতাংশ।
রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলা: ৯ জন, প্রায় ৮ শতাংশ।
অন্যান্য অপরাধ: ৩ জন, প্রায় ৩ শতাংশ।
এ ছাড়া মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৯ জন বিদেশি নাগরিক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান ও ইয়েমেনের নাগরিকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৮৩টি এমন অপরাধের জন্য কার্যকর করা হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সম্পর্ক ছিল না।
ইএসওএইচআরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে কার্যকর হওয়া ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৮৪টি দেওয়া হয়েছিল ‘তাজির’ বিধানের আওতায়। এটি বিচারকের বিবেচনামূলক ক্ষমতার ভিত্তিতে নির্ধারিত শাস্তি।
এ ছাড়া সংস্থাটি জানিয়েছে, ১০৮টি মামলার মধ্যে ৯১টির ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তারা বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কোনো তথ্য জানতে পারেনি কিংবা তা নথিবদ্ধ করতে পারেনি। মানবাধিকার সংস্থাটির মতে, এ পরিস্থিতি সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ঘাটতি তুলে ধরে।
প্রতিবেদনে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে গত জুনে সৌদ আল-ফারাজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা উল্লেখযোগ্য। জাতিসংঘের আইনবহির্ভূত আটকাদেশ-সংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপ এর আগে তাঁর আটকাদেশকে বেআইনি ও অযৌক্তিক বলে বিবেচনা করেছিল বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া ৯ এপ্রিল আলী আল-সুবাইতি নামের এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ইএসওএইচআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের মধ্যে মাত্র ১২ বছর বয়সে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও ছিল।
ইএসওএইচআরের দাবি, শৈশবে সংঘটিত কথিত অপরাধের জন্য সৌদি আরবে অন্তত পাঁচজন এখনো মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবে মতামত প্রকাশের অভিযোগে দণ্ডিত ৪৯ জনও মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে আছেন।
তাঁদের মধ্যে শেখ সালমান আল-আওদা ও শেখ হাসান আল-মালিকির নাম উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সাল থেকে সরকারি কৌঁসুলিরা তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে এলেও বিচারপ্রক্রিয়া এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।
সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা বিদেশি বন্দীদের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে ইএসওএইচআর। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, খামিস মুশাইত কারাগারে ৫৮ জন ইথিওপীয়, নাজরান কারাগারে পাঁচজন ইথিওপীয় ও পাঁচজন সোমালীয় এবং তাবুক কারাগারে আটজন মিসরীয় বন্দী রয়েছেন।
সংস্থাটি এসব বন্দীর মামলায় পেশাদার দোভাষীর অভাব, আইনি সহায়তা না পাওয়া, বিচারপ্রক্রিয়া বুঝতে অসুবিধা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ না থাকার মতো অভিযোগ নথিবদ্ধ করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা বন্দীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তাঁদের কয়েকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু বন্দীকে অল্প সময়ের জন্য অন্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার পর বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এদিকে সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’ করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরও সামনে এসেছে। সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে ১৪ অক্টোবর এ তথ্য প্রকাশ করে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি হলেন নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের পর তদন্ত শেষে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে আদালতে পাঠানো হয়। পরে ‘তাজির’ বিধানের আওতায় আদালত তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।
ইএসওএইচআরের মূল্যায়ন অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উচ্চ হার, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং অভিযুক্তদের আইনি অধিকার নিয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। সংস্থাটি বলছে, নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন ও শিশু অধিকার সনদের অধীনে দেশটির আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কিছু ঘটনার সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধই সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি নাগরিকদের উল্লেখযোগ্য অংশের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বিষয়টি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।