
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে মানসিক প্রতিবন্ধী এক বৃদ্ধের ১৪ শতক জমি লিখে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় কয়ড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য আবুল কালাম আজাদ ও তাঁর তিন ভাতিজার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীর পরিবার। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার কয়ড়া ইউনিয়নের বাঘলপুর গ্রামে।
ভুক্তভোগী আজিজুল হক সরকারের বয়স প্রায় ৮৫ বছর। তিনি বাঘলপুর গ্রামের মৃত মফিজ সরকারের ছেলে। পরিবারের দাবি, তিনি মানসিক প্রতিবন্ধী এবং বর্তমানে চোখেও দেখতে পান না। তাঁর ছেলে মো. ফারুক সরকার অভিযোগ করেছেন, বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে তাঁর বাবাকে বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করে নেওয়া হয়েছে।
ফারুক সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বাঘলপুর মৌজার ২২১ নম্বর দাগে তাঁদের বাড়ি ছাড়া ক্রয় ও রেকর্ড সূত্রে মাত্র ২৩ শতক ফসলি জমি রয়েছে। গত ৪ অক্টোবর তাঁর চাচাতো ভাই ও সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কালাম আজাদ এবং তাঁর স্বজনেরা আজিজুল হককে বাড়ি থেকে নিয়ে যান। পরে তাঁরা জানতে পারেন, ভাতার কার্ডের ব্যবস্থা না করে ওই দিনই দলিলের মাধ্যমে জমি লিখে নেওয়া হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, জমি গ্রহীতারা আজিজুল হককে বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে উল্লাপাড়া পৌরসভার ঝিকিড়া মহল্লার একটি বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর টিপসই নেওয়া হয়। এর আগে উল্লাপাড়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অসুস্থ ব্যক্তির জমি নিবন্ধনের জন্য কমিশনের আবেদন করা হয়েছিল। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাব-রেজিস্ট্রার তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে অফিসকর্মী আবদুল্লাহ আল নাঈমকে পাঠান।
ফারুক সরকার আরও অভিযোগ করেন, জমি রেজিস্ট্রির আগে ভাতার টাকা দেওয়ার কথা বলে ২০, ৫০ ও ১০০ টাকার নোট মিলিয়ে তাঁর বাবার হাতে ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। মানসিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় যেখানে টিপসই দিতে বলা হয়েছে, সেখানেই তিনি টিপসই দিয়েছেন বলে দাবি পরিবারের। এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং উল্লাপাড়া সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, তাঁর চাচা আজিজুল হককে ৭ লাখ টাকা দিয়ে সম্মতির ভিত্তিতে সরকারি নিয়ম মেনে জমি কিনেছেন তাঁরা। বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে জমি নেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।
জমিটির দলিল লেখক আবদুল মতিন বলেন, আজিজুল হক সরকার মানসিক ভারসাম্যহীন—এ বিষয়টি তিনি আগে জানতেন না। ক্রেতারা জমি কেনার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে দলিল লিখতে বলেছিলেন। সে অনুযায়ী তিনি দলিল তৈরি করেন। পরে অবৈধভাবে জমি লিখে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি জানতে পারেন বলে জানান তিনি।
উল্লাপাড়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার ফারহানা আজিজ বলেন, কমিশনের আবেদন পাওয়ার পর অসুস্থতা ও মানসিক ভারসাম্যহীনতার সনদ জমা দেওয়া হয়েছিল। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কমিশন মঞ্জুর করে অফিসকর্মী আবদুল্লাহ আল নাঈমকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হয়।
পরে আজিজুল হকের সঙ্গে ছলচাতুরী করে জমি নেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি জানতে পারেন বলে জানান তিনি। এ ঘটনায় দলিল লেখক আবদুল মতিনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে নোটিশের জবাব না দেওয়ায় তাঁকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্তের পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান সাব-রেজিস্ট্রার।
সাব-রেজিস্ট্রারের প্রতিনিধি হিসেবে ঘটনাস্থলে যাওয়া অফিসকর্মী আবদুল্লাহ আল নাঈম বলেন, ক্রেতা ও বিক্রেতারা কমিশনের আবেদনে উল্লেখ করা ঠিকানা অনুযায়ী তাঁকে উল্লাপাড়া পৌরসভার ঝিকিড়া মহল্লার একটি বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে জমি বিক্রেতা আজিজুল হককে নিয়ম অনুযায়ী প্রশ্ন করা হলে তিনি যথাযথ উত্তর দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন নাঈম। এরপর তিনি দলিলে আজিজুল হকের টিপসই নেন।
তাঁর ভাষ্য, ওই সময় ঘটনাটি ছলচাতুরী কি না, তা তিনি বুঝতে পারেননি। পরে আজিজুল হকের ছেলেরা সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে অভিযোগ করলে বিষয়টি জানতে পারেন।
সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উল্লাপাড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম বলেন, মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কাছ থেকে অবৈধভাবে জমি লিখে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি অবগত হয়েছেন। ছুটি শেষে অফিস খোলার পর দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
তবে জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার।