
ঠাকুরগাঁওয়ে শীতকাল শুরু হওয়ার আগেই বাজারে উঠতে শুরু করেছে আগাম শিম। জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাঠের পর মাঠ শিমের চাষ হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে ভালো দাম পেলেও উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমতে শুরু করেছে শিমের দাম। বর্তমানে কৃষকের কাছ থেকে পাইকাররা প্রতি কেজি শিম কিনছেন ৮৫ টাকায়। অথচ ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি বাজারে ভোক্তাদের একই শিম কিনতে হচ্ছে ১৪০ টাকা কেজি দরে।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জামালপুর ও পীরগঞ্জ উপজেলার খনগাঁও ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে আগাম শিমের চাষ বেশি দেখা যাচ্ছে। গত রোববার সকালে সদর উপজেলার বালিয়াখুড়ি ও পীরগঞ্জের চানগাঁও এলাকায় গিয়ে খেতজুড়ে শিমের ফুল ও কচি শিম দেখা যায়। কৃষকেরা খেত থেকে শিম তুলে বাছাই করে বস্তায় ভরছিলেন। সরবরাহ আরও বেড়ে যাওয়ার আগে ভালো দামে ফসল বিক্রি করে লাভের আশা করছেন তাঁরা।
কৃষকদের ভাষ্য, অন্য অনেক ফসলের তুলনায় শিম চাষে খরচ তুলনামূলক কম এবং অল্প সময়েই ফলন পাওয়া যায়। তবে আগাম শিম বাজারে তুলতে পারলে ভালো দাম মিললেও একসঙ্গে অনেক কৃষকের ফসল বাজারে এলে দাম দ্রুত কমে যায়। ফলে এ চাষে লাভের সম্ভাবনার পাশাপাশি লোকসানের ঝুঁকিও রয়েছে।
সদর উপজেলার বালিয়াখুড়ি গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন ২৫ শতক জমিতে শিম চাষ করেছেন। এ পর্যন্ত চার দফায় তাঁর খেত থেকে শিম উঠেছে। প্রথম দফায় ১০ কেজি শিম প্রতি কেজি ১৫০ টাকায় বিক্রি করেন তিনি। দ্বিতীয় দফায় ১৮ কেজি বিক্রি করেন ১২০ টাকা দরে এবং তৃতীয় দফায় ৩০ কেজি বিক্রি করেন ১০০ টাকা কেজিতে। সর্বশেষ ১০০ কেজি শিম বিক্রি করেছেন ৮৫ টাকা দরে। সব মিলিয়ে চার দফায় তাঁর বিক্রি হয়েছে ১৫ হাজার টাকার শিম।
দেলোয়ার হোসেন জানান, ২৫ শতক জমিতে বীজ, সার, কীটনাশক ও মাচা তৈরিতে তাঁর খরচ হয়েছে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। খেতে এখনো বেশ কিছু শিম রয়েছে। বাজারে দাম ভালো থাকলে উৎপাদন খরচ তুলে লাভ করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।
পীরগঞ্জের চানগাঁও গ্রামের কৃষক হামিদুল ইসলাম (৪৮) এবার ৩৩ শতক জমিতে শিমের আবাদ করেছেন। ইতিমধ্যে দুই মণ শিম বিক্রি করেছেন তিনি। হামিদুল বলেন, মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি শিম ১৪০ টাকায় বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু গত শনিবার বিক্রি করতে হয়েছে ৯০ টাকা কেজি দরে। শুরুতে ভালো দাম পাওয়ার আশাতেই আগাম শিম চাষ করেন তিনি।
একই উপজেলার শিমুলপুর গ্রামের সাদেকুল ইসলাম (৩৫) ছয় বছর ধরে ২৫ শতক জমিতে আগাম শিম চাষ করছেন। এবার তাঁর উৎপাদন খরচ হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার টাকা। ইতিমধ্যে দুই দফায় এক মণ শিম বিক্রি করেছেন। সাদেকুল জানান, গত বছর একই জমি থেকে প্রায় ৯০ মণ শিম পেয়েছিলেন। শুরুতে কেজিপ্রতি ১৫০ টাকা পেলেও পরে দাম দ্রুত কমে যায়। একপর্যায়ে প্রতি কেজি মাত্র ১০ টাকায়ও শিম বিক্রি করতে হয়েছিল তাঁকে।
বালিয়াখুড়ি গ্রামের পরিমল রায় (৫৮) এবার ৫০ শতক জমিতে আগাম শিম চাষ করেছেন। এ পর্যন্ত দুই মণ শিম বিক্রি করেছেন তিনি। দুই দিন আগে ৫৫ কেজি শিম বিক্রি করেছিলেন প্রতি কেজি ১১০ টাকায়। এরপর শনিবার সকালে আরও ২৫ কেজি বিক্রি করেন ৮৫ টাকা কেজি দরে।
চানগাঁও গ্রামের আশরাফুল ইসলাম (৫৫) পাশের জমিতে ১৫ শতক জায়গায় ১০ বছর ধরে আগাম শিম চাষ করছেন। এ বছর তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ১২ হাজার টাকা। এরই মধ্যে প্রায় ১০ হাজার টাকার শিম বিক্রি করেছেন তিনি।
তবে আবহাওয়া ও পোকামাকড়ের আক্রমণ শিম চাষে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। চানগাঁও গ্রামের কৃষক শরিফুল ইসলাম (৬২) বলেন, অতিবৃষ্টি, অসময়ে বৃষ্টি ও অতিরিক্ত গরমে শিমগাছের ফুল ঝরে যেতে পারে। কখনো শিকড় পচে যায়। এ ছাড়া ফল ছিদ্রকারী পোকা ও জাব পোকার আক্রমণে গাছের ক্ষতি হয়। এসব সমস্যা দেখা দিলে বাড়তি বালাইনাশক ব্যবহার করতে হয়, ফলে বেড়ে যায় উৎপাদন খরচ।
খেত থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর আগেই শিমের দাম কয়েক ধাপে বাড়ছে। বর্তমানে কৃষকের কাছ থেকে পাইকাররা প্রতি কেজি শিম কিনছেন ৮৫ টাকায়। পরে আড়তে বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা কেজি দরে। আর ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি বাজারে ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে ১৪০ টাকা কেজিতে। অর্থাৎ কৃষকের বিক্রয়মূল্য ও খুচরা বাজারের দামের ব্যবধান প্রতি কেজিতে ৫৫ টাকা।
পীরগঞ্জের লোহাগাড়া গ্রামের জহিরুল ইসলাম (৩৭) কৃষকের খেত থেকে শিম কিনে আড়তে সরবরাহ করেন। তিনি বলেন, খেত থেকে শিম সংগ্রহের পর বাছাই করতে হয়। বাছাইয়ের সময় কিছু শিম বাদ পড়ে। এরপর শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ যুক্ত হয়। এসব ব্যয় হিসাব করেই বিক্রির দাম নির্ধারণ করতে হয়।
ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। তবে গত বছর জেলায় ৫৪৫ হেক্টর জমিতে আগাম শিমের আবাদ হয়েছিল। উৎপাদিত শিম জেলার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সরবরাহ করা হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি ও পরিবেশ সবজি চাষের জন্য উপযোগী। এ কারণে আগাম শিমসহ শীতকালীন সবজি চাষে কৃষকদের আগ্রহ রয়েছে। সাধারণত মার্চ-এপ্রিলে আগাম শিমের বীজ বপন করা হয়, তবে মে-জুন মাসেও বপন করা হয়।
তিনি আরও জানান, কৃষকদের মানসম্মত বীজ সরবরাহের পাশাপাশি চাষাবাদে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আবাদ ভালো হয়েছে। তবে বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমে যায়। তাই কৃষকদের উৎপাদনের পাশাপাশি বাজার পরিস্থিতির দিকেও নজর রাখতে হবে।