
দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন প্রক্রিয়া সহজ করতে সর্বোচ্চ ৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার প্রকল্পের সুযোগ রেখে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার।
গতকাল আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় অধ্যাদেশটি গেজেট আকারে প্রকাশ করে। এতে ভবনের ছাদ, আঙিনা, পরিত্যক্ত জমি, চা বাগান ও জলাশয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পাশাপাশি অর্থায়ন, নেট-মিটারিং, সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন এবং প্রকল্প তদারকির নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতি চুরি, ভাঙচুর, অবৈধ সংযোগ ও কাজে বাধা দেওয়ার জন্যও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারি কোম্পানি এবং বাসাবাড়িতেও বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা যাবে।
এ ছাড়া ভবন, পার্কিং লট, গ্যারেজ, বাণিজ্যিক ও শিল্প স্থাপনার ছাদ, পরিত্যক্ত জমি, জলাশয় এবং চা বাগানেও সৌরপ্যানেল স্থাপনের সুযোগ থাকবে। ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ও কৃষি-সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তিও এই ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হবে।
এসব প্রকল্পের সর্বোচ্চ সক্ষমতা হবে ৫ মেগাওয়াট। তবে বড় আকারের ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এই অধ্যাদেশের আওতায় পড়বে না।
বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ওপেক্স মডেলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ পদ্ধতিতে সার্ভিস প্রোভাইডার নিজস্ব অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে। উৎপাদিত বিদ্যুতের অংশ বা মূল্য চুক্তি অনুযায়ী সমন্বয় করা হবে।
অন্যদিকে, যেসব গ্রাহকের নিজস্ব অর্থায়নের সক্ষমতা রয়েছে, তাঁরা ক্যাপেক্স মডেলে নিজেরাই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারবেন।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ সহজ পদ্ধতিতে জেলাভিত্তিক সার্ভিস প্রোভাইডারদের তালিকা সংরক্ষণ করবে। গ্রাহকেরা প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অথবা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করতে পারবেন।
বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের ক্ষেত্রে গ্রাহক, সার্ভিস প্রোভাইডার এবং উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করতে হবে। সরকার নির্ধারিত আদর্শ চুক্তিনমুনা অনুসরণ করে এই চুক্তি সম্পন্ন হবে।
চুক্তিতে স্থান ব্যবহারের অধিকার, যন্ত্রপাতির মান, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রস্তুতকারকের বাতিল যন্ত্রপাতি ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা বা ‘টেক-ব্যাক স্কিম’, বিদ্যুতের মূল্যহার এবং নেট-মিটারিং সুবিধার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার নেট-মিটারিং সংক্রান্ত প্রণোদনামূলক কার্যক্রমও ঘোষণা করবে।
বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ক্যাপেক্স মডেলে সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত পণ্য ও সেবা কেনার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ক্রয়প্রক্রিয়ায় ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবহার বাধ্যতামূলক থাকবে না। এর মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ এবং নীতিগত সমন্বয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে জাতীয় পলিসি কাউন্সিল গঠন করা হবে। এতে অর্থ, আইন ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী এবং জ্যেষ্ঠ সচিবেরা সদস্য হিসেবে থাকবেন।
জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে কারিগরি ও সমন্বয় কমিটি গঠন করা হবে। এতে পুলিশ সুপার, স্থানীয় প্রকৌশলী এবং বিদ্যুৎ সংস্থার জেলা পর্যায়ের প্রধানেরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এই কমিটি প্রতি তিন মাস অন্তর জাতীয় পলিসি কাউন্সিলের কাছে প্রতিবেদন দেবে।
অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে উপজেলা কারিগরি ও সমন্বয় কমিটি মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম তদারকি করবে। এ কমিটি প্রতি মাসে জেলা কমিটির কাছে প্রতিবেদন জমা দেবে।
এ ছাড়া টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) তাদের ওয়েবসাইটে স্থাপিত বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার তথ্য সংরক্ষণ করবে এবং সেগুলো সচল রয়েছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অধ্যাদেশে বিভিন্ন অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
চুরি: বিদ্যুৎ বা যন্ত্রাংশ চুরি, চোরাই পণ্য কেনাবেচা কিংবা হেফাজতে রাখার অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
ভাঙচুর: সৌরপ্যানেল বা যন্ত্রাংশ ভাঙচুর কিংবা ক্ষতিসাধনের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
অবৈধ সংযোগ ও কাজে বাধা: উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া সংযোগ স্থাপন এবং স্থাপন, পরিদর্শন বা রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত কর্মীদের বাধা দিলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।
এসব অপরাধের বিচার প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে করা যাবে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেও বিচার করা সম্ভব হবে।
অধ্যাদেশে আরও বলা হয়েছে, এর অধীনে সরল বিশ্বাসে কোনো কাজ করার কারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও সংশ্লিষ্ট সরকার, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কিংবা কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা অথবা অন্য কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
নতুন এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, অর্থায়ন, পরিচালনা ও তদারকির জন্য একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করেছে সরকার। এর আওতায় ছাদ, জলাশয় ও অন্যান্য উপযুক্ত স্থানে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের সুযোগ রাখা হয়েছে।