
ইয়েমেনের হাউছি গোষ্ঠীর অস্ত্রভাণ্ডারে বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান বা ড্রোন রয়েছে। এসব অস্ত্রের মাধ্যমে সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। সাম্প্রতিক হামলার অভিযোগের পর গোষ্ঠীটির সামরিক শক্তি ও অস্ত্র সরবরাহের উৎস আবারও আলোচনায় এসেছে।
পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) এএফপির বরাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হাউছিদের অস্ত্রভাণ্ডার, ইরানের কথিত সহায়তা এবং দীর্ঘ সময় সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে।
তবে হামলার সংখ্যা, ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন এবং বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা সম্পর্কে সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য ও বিশ্লেষণ আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরগুলোতে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে হাউছিদের বিরুদ্ধে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরও এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মদিনা ও মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা প্রতিহত করার দাবিও করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
প্রতিবেদনে সংঘাতের নতুন পর্যায়ের পেছনে ইয়েমেনের রাজধানী সানার বিমানবন্দরে সৌদি বাহিনীর হামলার ঘটনাকে উল্লেখ করা হয়েছে। গত জুলাইয়ে হাউছি প্রতিনিধিদলের বিমানবন্দরে অবতরণ ঠেকাতে ওই হামলা চালানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ এপ্রিল লংলি অ্যালির মতে, এরপর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। তাঁর বিশ্লেষণে, হাউছিরা নিজেদের অভিযানকে অবরোধের জবাবে অবরোধ এবং বিমানবন্দরে হামলার জবাবে পাল্টা হামলা হিসেবে তুলে ধরছে।
হাউছিদের হাতে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও বিভিন্ন ধরনের ড্রোন রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অস্ত্রের কিছু ইরানি নকশার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
উন্মুক্ত গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান জেনসের অস্ত্রবিশেষজ্ঞ নিরঞ্জন বিএসের মতে, ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর হাউছিরা দেশটির সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারের একটি অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। পরবর্তী সময়ে পাচার করা অস্ত্র ও যন্ত্রাংশ এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের অস্ত্রের মজুত বাড়ে বলে বিশ্লেষকেরা ধারণা করেন।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সামরিক সক্ষমতাবিষয়ক তথ্যভাণ্ডারে হাউছিদের হাতে বিভিন্ন ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ইরানি নকশার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। প্রতিবেদনে খাইবার শেকান নামের ক্ষেপণাস্ত্রের কথাও এসেছে।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত উৎক্ষেপণের পর নির্দিষ্ট গতিপথ অনুসরণ করে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যায়। এর পাল্লা, নির্ভুলতা ও কার্যকারিতা ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা এবং ব্যবহৃত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উইলসন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, হাউছিদের কাছে স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি আছেফ নামের জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এটি ইরানের খালিজ ফার্স শ্রেণির ক্ষেপণাস্ত্রের নকশার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মূলত সমুদ্রে চলাচলকারী জাহাজকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়। তবে এগুলোর প্রকৃত সক্ষমতা ও ব্যবহার নির্ভর করে নির্দিষ্ট অস্ত্রের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যের ওপর।
হাউছিদের অস্ত্রভাণ্ডারে ইরানের কুদস শ্রেণির ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। উইলসন সেন্টারের ধারণা অনুযায়ী, কুদস-৪ সংস্করণের সম্ভাব্য পাল্লা প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার হতে পারে।
তবে ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা সম্পর্কে প্রকাশিত অনুমানকে নিশ্চিত কার্যকর পাল্লা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রকৃত সক্ষমতা নির্ভর করে অস্ত্রের সংস্করণ, প্রযুক্তিগত অবস্থা এবং ব্যবহারের পরিস্থিতির ওপর।
ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি হাউছিদের অস্ত্রভাণ্ডারে বিভিন্ন ধরনের চালকবিহীন আকাশযান রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে কিছু একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন হিসেবে পরিচিত—যেগুলো লক্ষ্যবস্তুর দিকে গিয়ে আঘাত হানার জন্য তৈরি।
জেনসের বিশ্লেষক নিরঞ্জন বিএসের মতে, ওয়ায়েদ-১ ও ওয়ায়েদ-২ নামের ড্রোন ইরানের শাহেদ-১৩১ ও শাহেদ-১৩৬ নকশার স্থানীয় সংস্করণ বলে বিবেচিত হয়।
এ ধরনের ড্রোনের ব্যবহার আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোনো হামলায় কোন ধরনের ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রমাণ ও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
হাউছিদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আলোচনায় ইরানের ভূমিকা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান সরবরাহসহ বিভিন্নভাবে ইরান হাউছিদের সামরিক সহায়তা দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের কিছু যন্ত্রাংশ ইরানে তৈরি হওয়ার পর ছোট নৌযান, পণ্যবাহী জাহাজ কিংবা ওমান-ইয়েমেন সীমান্ত ব্যবহার করে ইয়েমেনে পাচার করা হয় বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। পরে এসব যন্ত্রাংশ জোড়া লাগিয়ে অস্ত্র তৈরি করা হতে পারে।
২০২৪ সালের জুনে হাউছিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে চীনে এক ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ ছিল, ইয়েমেনে উন্নত প্রচলিত অস্ত্র তৈরির উপকরণ সংগ্রহে ওই ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
তবে অস্ত্রের নকশা, যন্ত্রাংশের উৎস ও সরবরাহপথ সম্পর্কে বিভিন্ন দেশের সরকারি অভিযোগ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণকে পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো নির্দিষ্ট অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘ সময় ধরে সংঘাতে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা হাউছিদের সামরিক সক্ষমতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। সৌদি আরব ও তাদের সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযানের মুখেও গোষ্ঠীটি অতীতে টিকে থেকেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ এপ্রিল লংলি অ্যালির মতে, দীর্ঘ সংঘাতের অভিজ্ঞতা এবং প্রতিপক্ষের তুলনায় হারানোর মতো সম্পদ কম থাকার বিষয়টি হাউছিদের কৌশলগত হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে দীর্ঘদিন লড়াই চালানোর সক্ষমতা শুধু অস্ত্রের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। অস্ত্র ও যন্ত্রাংশের সরবরাহ, অর্থায়ন, জনবল, গোয়েন্দা তথ্য, সামরিক অবকাঠামো এবং প্রতিপক্ষের প্রতিরোধক্ষমতাও এতে ভূমিকা রাখে।
হাউছিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা ইয়েমেনের সংঘাতকে দেশটির সীমানার বাইরেও প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
এই জলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে হামলার ঝুঁকি বাড়লে জাহাজ চলাচল, বাণিজ্যিক পরিবহন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, হাউছিদের অস্ত্রভাণ্ডারে বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন থাকার তথ্য তাদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের কারণ। তবে অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা, কার্যকর পাল্লা, সরবরাহের উৎস এবং সাম্প্রতিক হামলার সুনির্দিষ্ট বিবরণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের প্রয়োজন।