
বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার ও সংস্কার কৌশলকে গুরুত্ব দিয়ে সহায়তা দিতে প্রস্তুত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. তিতুমীর জানান, বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রমে সহযোগিতার বিষয়টি এবার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদাররা স্পষ্টভাবে তুলে ধরছেন। এতে দেশের পরিকল্পনা ও কৌশল অনুসারে সংস্কার বাস্তবায়নের সুযোগ আরও জোরালো হচ্ছে।
উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও বাংলাদেশের অগ্রাধিকার অনুযায়ী সংস্কারে সহযোগিতা করছে বলে জানান উপদেষ্টা।
আইএমএফের ঋণসহায়তা পেতে বিভিন্ন শর্ত কোনো বাধা তৈরি করবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বিষয়গুলো এগিয়ে নেওয়া হবে। সরকার প্রতিটি পদক্ষেপ দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রেও দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে সরকার আশাবাদী।
আইএমএফের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস সম্পর্কে ড. তিতুমীর বলেন, সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত না হলে অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সেই দৃষ্টিকোণ থেকেও আন্তর্জাতিক সংস্থাটির পূর্বাভাস বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিভিন্ন সংস্থার পূর্বাভাসে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। অতীতের তথ্য অনুযায়ী, আইএমএফের প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ সাধারণত তুলনামূলক সংরক্ষণশীল হয়ে থাকে।
উপদেষ্টার ভাষ্য অনুযায়ী, আইএমএফের আর্টিকেল ফোর মিশনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে, সরকার চলতি বাজেটে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার আশাবাদী।
তিনি আরও বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে সংস্কারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ভবিষ্যতে পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশলেও এসব অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হবে। পরিকল্পিত সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব বলে সরকার মনে করছে।
মূল্যস্ফীতির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন ড. তিতুমীর। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির প্রভাবের পাশাপাশি অতীত থেকে চলে আসা দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতিও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলে জানান তিনি।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির দুর্বলতা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, অতীতে এসব কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা ছিল। যাঁদের সহায়তা পাওয়ার কথা, তাঁদের অনেকে তালিকার বাইরে থেকে গেছেন। আবার প্রকৃত সুবিধাভোগী নন, এমন ব্যক্তিরাও তালিকাভুক্ত হয়ে সুবিধা পেয়েছেন। কর্মসূচিগুলো বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হওয়ায় প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে গত কয়েক বছরে কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে দারিদ্র্য বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মতো উদ্যোগ নিচ্ছে। এসব ব্যবস্থায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উপকারভোগী নির্বাচন করে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করতে ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান উপদেষ্টা। সামাজিক খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্য এবং স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনাকে উন্নয়ন সহযোগীরা ইতিবাচকভাবে দেখছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার অনুযায়ী এসব খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনায় এসেছে বলে জানান তিনি।
রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরে ড. তিতুমীর বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির অনুপাতে কর আহরণের হার ১০ শতাংশে উন্নীত করতে চায় সরকার। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং আর্থিক খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর আর্থিক বিবরণী ও ব্যালান্স শিটের স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।
অতীতের আর্থিক অনিয়মের প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, ব্যাংকসহ বিভিন্ন খাত থেকে অর্থ লুটপাটের কারণে দেশের সাধারণ মানুষকে বড় ধরনের মূল্য দিতে হচ্ছে। তাঁর দাবি, ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার লুট করা হয়েছে। এ অর্থ জনগণের, তাই আর্থিক অনিয়ম ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
তিনি বলেন, অর্থ আত্মসাৎকারী এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সহায়তাকারীরা দেশে কিংবা বিদেশে যেখানেই থাকুক, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। খেলাপি ঋণ ও আর্থিক অনিয়ম মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
লুটপাটে সহায়তাকারীদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের প্রবণতা কমতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
উল্লেখ্য, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা ১২ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শুরু হয়েছে। সভাটি চলবে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত। এতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আর্থিক স্থিতিশীলতা, দারিদ্র্য বিমোচন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।