
সুনীল অর্থনীতি ও সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার খাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। তিনি বলেছেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক লাখ কোটি ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করতে হলে সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) বঙ্গোপসাগর গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিএমকে লেকচার গ্যালারিতে ‘বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতি খাতের উদীয়মান শিল্প নিয়ে পরিকল্পনাগত দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে সমুদ্রসম্পদনির্ভর নতুন শিল্পের সম্ভাবনা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সুনীল অর্থনীতি নিয়ে কাজ করার জন্য একটি সেল রয়েছে। এ খাতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে সবাইকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ চলছে।
তিনি বলেন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সুনীল অর্থনীতির বিকাশে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জাহাজ নির্মাণশিল্প, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও বন্দর উন্নয়ন। এসব খাতের সক্ষমতা বাড়াতে সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
দেশের বন্দরগুলোর সঙ্গে উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করাও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলে জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে শুধু সড়ক যোগাযোগের ওপর নির্ভর না করে রেল ও নৌপথের উন্নয়নেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা জরুরি। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতাসম্পন্ন জনবল তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে। পাশাপাশি সরকারি খাত, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, আইইউবি ও বঙ্গোপসাগর গবেষণা কেন্দ্র এ বিষয়ে কাজ করছে এবং সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালাচ্ছে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইইউবির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য জাভেদ হোসেন বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনা ও পণ্য পরিবহনে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রায় সব কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজ চট্টগ্রাম বন্দরে সম্পন্ন হয়। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২১ হাজার টন জ্বালানি তেলবাহী একটি জাহাজ থেকে তেল খালাস করতে বাংলাদেশে তিন থেকে পাঁচ দিন সময় লাগে। অথচ সিঙ্গাপুরে একই কাজ করতে সময় লাগে মাত্র চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা।
পোশাক রপ্তানির সময় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জাভেদ হোসেন। তিনি জানান, বাংলাদেশে তৈরি পোশাক কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে প্রায় ৯৫ দিন সময় লাগে। তুলনায় ভিয়েতনামে সময় লাগে ৬১ দিন এবং চীনে ৩২ দিন। তাঁর মতে, এ ধরনের বিলম্বের পেছনে দুর্নীতি একটি কারণ।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন আইইউবির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গোপসাগর গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল খুরশেদ আলম। তিনি বঙ্গোপসাগর, সুনীল অর্থনীতি এবং এ খাতের উদীয়মান শিল্পগুলোর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠান শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন আইইউবির স্কুল অব লিবারেল আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেসের ডিন অধ্যাপক ড. বখতিয়ার আহমেদ। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী মারিয়াম বিনতে হাসান ফারিন।
সেমিনারে আলোচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমুদ্রসম্পদের সম্ভাবনা কাজে লাগানো, বন্দর অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির গুরুত্ব উঠে আসে।