
দেশের ব্যাংকিং খাতে সম্পদ ও আমানতের বণ্টন তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত হলেও খেলাপি ঋণের চিত্রে দেখা যাচ্ছে বড় ধরনের বৈষম্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৭৪ শতাংশই মাত্র ১০টি ব্যাংকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। অথচ দেশের মোট সম্পদ ও আমানতের অর্ধেকেরও কম অংশ রয়েছে তাদের নিয়ন্ত্রণে। এতে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি পুরো ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার প্রতিফলন নয়; বরং কিছু ব্যাংকের দীর্ঘদিনের দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণের ফল। বিশেষ করে অতীতে বিতর্কিত ঋণ অনুমোদন ও গোষ্ঠীভিত্তিক ঋণ বিতরণের ঘটনাগুলো বর্তমান সংকটকে আরও গভীর করেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরীর মতে, অতীতে বড় গ্রাহকদের খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য গোপন রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে কঠোর নজরদারির কারণে সেই তথ্য সামনে আসায় খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে মাত্র ১০টি ব্যাংকের কাছেই রয়েছে ৭৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ খেলাপি ঋণ।
অন্যদিকে সম্পদের হিসাবে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের অংশ মাত্র ৪৭ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং আমানতের ক্ষেত্রে ৪৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অর্থাৎ সম্পদ ও আমানতের তুলনায় খেলাপি ঋণের হার অনেক বেশি হওয়ায় আর্থিক ঝুঁকি বেড়েছে।
প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, দেশের মোট খেলাপি ঋণের অর্ধেকের বেশি মাত্র পাঁচটি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত। এসব ব্যাংকের হাতে মোট সম্পদের প্রায় ৩১ শতাংশ এবং আমানতের ৩২ শতাংশ থাকলেও খেলাপি ঋণের ৫১ শতাংশের বেশি তাদের দখলে রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ-এ, যার পরিমাণ ৯২ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে জনতা ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, যেসব ব্যাংকে দীর্ঘদিন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি ছিল এবং যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব বেশি ছিল, সেসব ব্যাংকেই খেলাপি ঋণের চাপ সবচেয়ে বেশি। অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ জামানত ছাড়া অথবা অতিমূল্যায়িত সম্পদ দেখিয়ে ঋণ অনুমোদনের অভিযোগও রয়েছে।
খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থাকেও দুর্বল করে তুলেছে। আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতের সম্মিলিত লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু খেলাপি ঋণ কমানোই নয়, বরং দায়ী ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, ঋণ পুনরুদ্ধার জোরদার করা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ বিতরণ বাড়ানোই এখন ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।