
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং তেলের মজুত দ্রুত কমে আসার আশঙ্কার মধ্যেই ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে এমন ইঙ্গিতই মিলেছে। তিনি স্বীকার করেছেন, পরিস্থিতি আরও জটিল হলে বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারত।
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা না হলে বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়ত। তার মতে, তখনকার পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিদ্যমান তেল মজুত দীর্ঘ সময় চাহিদা পূরণে সক্ষম ছিল না এবং সরবরাহ সংকট তীব্র আকার ধারণ করতে পারত।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব হতো না। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বৈশ্বিক তেল পরিবহনের বড় একটি অংশ সম্পন্ন হয়। ফলে সেখানে যেকোনো ধরনের অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য কার্যত স্বীকার করে যে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের কৌশলগত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছিল। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দেয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া সামরিক উত্তেজনার পর থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়তে থাকে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সতর্ক করে জানায়, বাণিজ্যিক তেলের মজুত দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় ওয়াশিংটনের ওপর দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর চাপ তৈরি হয় বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হয়েছে। এতে লেবাননসহ বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সামরিক অভিযান বন্ধ, উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চুক্তির অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত রাখা এবং নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও দুই পক্ষ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে বলে জানা গেছে। ইরানের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করা হচ্ছিল, তাদের বিরুদ্ধে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের জবাব হিসেবেই হরমুজ প্রণালিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের আগেই দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব সমঝোতার নথিতে সম্মতি দিয়েছেন। তেহরানের ঘনিষ্ঠ মহল এই চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছে, কারণ এতে ইরান নিজেদের সার্বভৌম অবস্থান বজায় রেখেই উত্তেজনা হ্রাস এবং কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা শুধু যুদ্ধের ঝুঁকি কমানোর জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে স্থিতিশীল রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর সফলতা নির্ভর করবে উভয় পক্ষের আস্থা, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার অগ্রগতির ওপর।