
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আগামী ১৬ ডিসেম্বর দেশের মানুষের জন্য উপহার হিসেবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত থার্ড টার্মিনাল চালুর যে পরিকল্পনা ছিল, তা এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। পরিচালনা চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার শেষ পর্যায়ে এসে জাপানি কনসোর্টিয়ামের নতুন শর্ত এবং অতিরিক্ত সময়ের আবেদনে পুরো প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, একাধিক দফা আলোচনার পর টার্মিনাল পরিচালনার কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়েছিল। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় টার্মিনাল পরিচালনাসংশ্লিষ্ট চারটি প্রধান খাত থেকে অর্জিত আয়ের ৭৩ শতাংশ পাবে জাপানি কনসোর্টিয়াম এবং বাকি ২৭ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ইতোমধ্যে রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) জারি করেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩০ জুনের মধ্যে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর চূড়ান্ত প্রস্তাব জমা দেওয়ার কথা ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে তারা জানায়, এখনই চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য প্রস্তুত নয় এবং আরও দুই মাস সময় প্রয়োজন। একই সঙ্গে তারা বেশ কিছু নতুন শর্তও যুক্ত করেছে, যা আলোচনার প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বেবিচকের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত সময় মঞ্জুর করা হলে চলতি বছরের মধ্যেই থার্ড টার্মিনাল চালু করা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ, জাপানি পক্ষের প্রস্তাব অনুযায়ী চুক্তি স্বাক্ষরের পর কার্যক্রম শুরু করতে তাদের আরও ছয় মাস প্রস্তুতির সময় লাগবে। ফলে ১৬ ডিসেম্বর উদ্বোধনের নির্ধারিত লক্ষ্য বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে সরকারি হিসাব অনুযায়ী থার্ড টার্মিনালের শতভাগ নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। টেন্ডারের বাইরে অতিরিক্ত কাজের আর্থিক বিষয়েও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। তবে প্রকল্পের মেয়াদ চলতি মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সেটি আরও এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করার আবেদন করা হয়েছে।
নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই থার্ড টার্মিনাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনুমোদন নিয়েই জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে পরিচালনা চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে নেওয়া হয়।
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিকী জানিয়েছেন, জাপানি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। চলতি মাসেই তাদের চূড়ান্ত প্রস্তাব দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তারা আরও দুই মাস সময় চেয়েছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়কে জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী আগামী ১৬ ডিসেম্বর থার্ড টার্মিনাল চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘ দুই বছর ধরে আলোচনার পর শেষ মুহূর্তে জাপানি পক্ষের এমন অবস্থান বিস্ময়কর। তবে বেবিচক এখনও আশাবাদী যে সরকারের উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগ ও সহযোগিতা থাকলে নির্ধারিত সময়েই টার্মিনাল চালু করা সম্ভব হতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয় এবং ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রায় ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে সরকারের পাশাপাশি অর্থায়ন করেছে জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা Japan International Cooperation Agency। নির্মাণকাজ শেষ হলেও পরিচালনা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এখনও টার্মিনালটি চালু করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় কিছু আধুনিক যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা ও মেয়াদ নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ফলে দেশের সবচেয়ে বড় বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের উদ্বোধন এখন সময় ও সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।